চ্যাট গ্রুপে দেওয়া অর্থের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে খুব কমই পূরণ হয়। ২০২৬ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে নিউ ইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ন্যানোবিট লিমিটেড (NanoBit Limited) এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছে: জরিমানা, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ফেরত এবং সুদ মিলিয়ে মোট পাওনার পরিমাণ ৫৫.২ লক্ষ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) প্রমাণ করেছে যে, এই প্ল্যাটফর্মটির অস্তিত্ব ছিল শুধুমাত্র স্মার্টফোনের পর্দায়। প্রতারকরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের হোয়াটসঅ্যাপের গোপন গ্রুপে প্রলুব্ধ করত, নিজেদের ব্রোকার হিসেবে পরিচয় দিত এবং অস্তিত্বহীন আইসিও-র (ICO) বিজ্ঞাপন দিত। তারা দাবি করত যে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে নিবন্ধিত, এবং বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে ভুয়া মূল্যের চার্ট ও অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স দেখাত। বাস্তবে একটি লেনদেনও সম্পন্ন হয়নি: বিনিয়োগকারীদের অর্থ সরাসরি হংকংয়ের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হতো এবং পরে এই চক্রের সদস্যদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করা হতো।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অভিযোগ দায়েরের পর মামলাটি প্রায় দুই বছর ধরে চলে। বিবাদীরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় তাদের অনুপস্থিতিতেই রায় দেওয়া হয়েছে। দণ্ডিতদের তালিকায় শুধু ন্যানোবিট নয়, রেডিয়ান্ট হরাইজনস লিমিটেড, সুইট কার্মা ফ্যাশন ইনকর্পোরেশন, ঝাও ট্রপিক্যাল ডেলি ইনকর্পোরেশনের পাশাপাশি জিয়াজিয়ে লিউ এবং হুয়া ঝাও নামের দুই ব্যক্তিও রয়েছেন। এই ৫৫ লক্ষ ডলারের জরিমানা কেবল একটি শাস্তিই নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা: ক্রিপ্টো বাজারের নিয়মকানুন যেখানে দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে, সেখানেও পুরোনো কায়দার প্রতারণাগুলো এখনও কার্যকর।
হোয়াটসঅ্যাপ ভিত্তিক এই প্রতারণার আপাত সরলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক সুসংগঠিত কৌশল। গ্রুপে থাকা তথাকথিত ‘পরিচিত’ মানুষদের ওপর মানুষ ভরসা করে, যেখানে সবাই প্রকল্পের প্রশংসা করে এবং ভুয়া মুনাফার ছবি দেখায়। দ্রুত আয়ের লোভ এবং সুযোগ হারানোর ভয় এই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আগেই সতর্ক করেছিল: কেবল চ্যাট গ্রুপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করা উচিত নয় এবং বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া যে কারোরই নিবন্ধন যাচাই করা জরুরি। ন্যানোবিট এ ধরনের অসংখ্য মামলার একটি শৃঙ্খল মাত্র, যেখানে ক্রিপ্টো জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের পরিমাণ শত কোটি ডলারে ঠেকেছে।
এখানে উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। প্রতারকরা হাজার হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে ডিজিটাল মাধ্যমগুলোর সহজলভ্যতা এবং নাম গোপন রাখার সুযোগকে কাজে লাগায়। অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো প্রমাণ দিচ্ছে যে বিশেষ নতুন আইন ছাড়াও এই ধরনের প্রকাশ্য জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব। সাধারণ মানুষের জন্য এর বার্তা হলো: যেসব প্ল্যাটফর্ম স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করে না বা স্বতন্ত্র অডিট সম্পন্ন করে না, সেগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পানির মতোই অর্থ সর্বদা বাধার অভাব যেখানে, সেখানেই প্রবাহিত হয়। আদালতের রায় বা তদন্তের মতো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে সেই প্রবাহ কিছুটা থিতিয়ে আসে বটে, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয় না। প্রতিটি নতুন সাজা আমাদের মনে করিয়ে দেয়: ডিজিটাল দুনিয়ায় কারো ওপর আস্থা রাখার আগে সেটি চ্যাট গ্রুপে নয়, বরং অফিশিয়াল রেজিস্ট্রি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওয়েবসাইটে যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।

