আমরা অভিকর্ষকে এতটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নিই যে, এর অস্তিত্বের কথা আমাদের মাথায়ও থাকে না। জন্মের প্রথম নিশ্বাস থেকেই এটি আমাদের সঙ্গী হয় এবং মস্তিষ্ককে পরিবেশে দেহের অবস্থান বুঝতে ও আমাদের অন্তরের ‘আমি’ বা সত্তার বোধ গঠনে সাহায্য করে। কিন্তু ধ্রুব এই ভিত্তিটি যদি হঠাৎ অপসারিত হয়, তবে কী ঘটবে?
‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত ‘স্পেস ওডিসি: হাউ মাইক্রোগ্র্যাভিটি চেঞ্জেস ব্রেইন ফাংশন অ্যান্ড দ্য এক্সপেরিয়েন্স অফ কনশাসনেস’ শীর্ষক একটি নতুন নিবন্ধে লেখকরা ঠিক এই বিষয়টিই তুলে ধরেছেন।
গবেষকরা মাইক্রোগ্র্যাভিটিকে কেবল শরীরের জন্য একটি শারীরিক পরীক্ষা হিসেবেই দেখছেন না, বরং একে চেতনার প্রকৃতি নিয়ে গবেষণার এক অনন্য সুযোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, পৃথিবীর অভিকর্ষ মস্তিষ্ক পরিচালনার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘ লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ধারায় আমাদের স্নায়ুতন্ত্র প্রতিটি নড়াচড়ার সময় এই অভিকর্ষের প্রভাব আগেভাগেই বুঝতে এবং তা আমলে নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
ওজনহীন অবস্থায় আমাদের পরিচিত এই ভিত্তিটি হঠাৎ হারিয়ে যায়। এর ফলে শরীরের ভারসাম্য রক্ষার ভেস্টিবুলার সিস্টেম অস্বাভাবিক সংকেত পাঠাতে শুরু করে, যার ফলে ওপর-নিচের সাধারণ অনুভূতি ওলটপালট হয়ে যায় এবং মস্তিষ্ক বাধ্য হয়ে দেহ ও পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে নিজের অভ্যন্তরীণ ধারণাগুলো নতুন করে সাজায়।
নিবন্ধের লেখকরা এই প্রক্রিয়াটিকে ‘অ্যাক্টিভ ইনফারেন্স’ বা সক্রিয় অনুমানের তত্ত্বের সাথে যুক্ত করেছেন, যার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্ক বিশ্ব সম্পর্কে প্রতিনিয়ত পূর্বাভাস দেয় এবং প্রাপ্ত তথ্যের সাথে সেগুলোর তুলনা করে। যখন অভিকর্ষের মতো একটি প্রধান দিকনির্দেশক আর পরিচিত পদ্ধতিতে কাজ করে না, তখন অনুমানের ক্ষেত্রে ভুলের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ, মস্তিষ্ক নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করে এবং শরীরের অবস্থান ও পারিপার্শ্বিকতার সাথে তার সম্পর্কের ধারণাগুলো পুনরায় মূল্যায়ন করে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মহাকাশচারীদের বর্ণিত কিছু অভিজ্ঞতা মানুষের চেতনার পরিবর্তিত অবস্থার সময় অনুভূত হওয়া পরিবর্তনের কথা মনে করিয়ে দেয়। মহাশূন্যে অবস্থানকারীরা স্থান সম্পর্কে এক বিচিত্র অনুভূতি, দেহের উপলব্ধিতে ভিন্নতা এবং নিজস্ব ব্যক্তিত্বের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। লেখকরা জোর দিয়েছেন যে, এ ধরনের পর্যবেক্ষণগুলো নিয়ে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন থাকলেও এগুলো মহাকাশকে মানুষের চেতনা গবেষণার একটি অনন্য ল্যাবরেটরি হিসেবে তুলে ধরেছে।
এই নিবন্ধটি এমন কোনো দাবি করছে না যে ওজনহীনতা মানুষের চেতনাকে ‘প্রখর’ করে তোলে। বরং এটি একটি নতুন চিন্তার খোরাক দেয় যে, আমাদের বাস্তবতা এবং আত্ম-উপলব্ধি হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি অভিকর্ষের ওপর নির্ভরশীল।
যদি এই ধারণাটি ভবিষ্যতে গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, তবে মহাকাশ অভিযান বিজ্ঞানীদের সামনে মানুষের ‘সত্তা’র অনুভূতির মূলে থাকা রহস্য উন্মোচন এবং মস্তিষ্ক কীভাবে ব্যক্তিনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার এক ধারাবাহিক ছবি তৈরি করে, তা বোঝার এক অনন্য দুয়ার খুলে দেবে।




