আর্জেন্টিনায় লিওনেল মেসিকে ঘিরে যে উন্মাদনা, তা অনেক আগেই যুক্তির সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। তবে ২০২৬ সালের জুনে তা এক বিশাল এবং বাস্তব রূপ লাভ করেছে। পাতাগোনিয়ার তেল সমৃদ্ধ শহর কুত্রাল-কো’র উপকণ্ঠে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের উচ্চতম কোনো ফুটবলারের ব্যক্তিগত স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয়েছে। ২৬ মিটার উচ্চতার এই বিশালাকার ভাস্কর্যটি ইস্পাত ও কংক্রিট দিয়ে তৈরি, যার মোট ওজন প্রায় ৭০ টন।
পাতাগোনিয়ার নেউকেন প্রদেশের এই ছোট শহর Cutral Có-তে ২২ নম্বর মহাসড়কের পাশে এই মনোলিথটি স্থাপন করা হয়েছে। এটি মূলত জাতীয় দলের সাফল্য এবং বিশেষ করে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতিকে অমলিন করে রাখার একটি প্রচেষ্টা। ভাস্কর আলদো বেরোইসা দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে ইস্পাত ও কংক্রিটের কাঠামোর ওপর এই বিশাল শিল্পকর্মটি তৈরি করেছেন।
এটি ভারতের কলকাতার সেই ২১ মিটারের মূর্তিটিকেও ছাড়িয়ে গেছে, যেটি নিরাপত্তার কারণে পরবর্তীতে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।
মানুষ কী বলছে?
- সামনে থেকে দেখলে এটি গর্বের প্রতীক: জাতীয় দলের জার্সিতে মেসি দাঁড়িয়ে আছেন, এক হাত হৃদয়ে এবং অন্য হাতটি বিশ্বকাপের ট্রফি নিয়ে উঁচিয়ে ধরেছেন।
- তবে পেছন থেকে বা বিশেষ কিছু কোণ থেকে দেখলে ইন্টারনেটে রীতিমতো মিমের ঝড় উঠেছে। ভাস্কর্যটির ভঙ্গি এবং অনুপাত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও রসিকতা চলছে (অনেকে রসিকতা করে একে ‘বসা’র ভঙ্গি এবং প্যান্টহীন কল্পনা বলে অভিহিত করছেন)। এটি যেন একটি ধ্রুপদী উদাহরণ—যখন কোনো ভাস্কর্য পরিকল্পনার চেয়ে কিছুটা বেশিই ‘প্রাণবন্ত’ হয়ে ওঠে।
মাত্র ৩৫ হাজার বাসিন্দার এই ছোট্ট শহরের জন্য এটি এখন একটি বড় পর্যটন আকর্ষণ এবং স্থানীয়দের গর্বের উৎস। আর্জেন্টিনা যেন প্রতিটি স্তরেই তাদের এই মহানায়ককে ঈশ্বরতুল্য আসনে বসানোর প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।
মেসি চিরন্তন। আর এই মূর্তিটি আক্ষরিক অর্থেই এক মহাকাব্যিক সৃষ্টি হয়ে উঠেছে, তা সে প্রশংসার মাধ্যমেই হোক বা মিমের মাধ্যমে।
শুরুতে পৌরসভা চেয়েছিল মেসির বাস্তব উচ্চতার সাথে মিল রেখে ১৭০ সেন্টিমিটারের একটি ছোট মূর্তি তৈরি করতে। তবে স্থানীয় ভাস্কর আলদো বেরোইসা যুক্তি দেন যে, এই মহান ফুটবলারের প্রতিভার বিশালত্ব ফুটিয়ে তুলতে আরও বিশালাকার অনুপাত প্রয়োজন। প্রায় এক বছর ধরে নির্মাণকাজ চলার পর ২২ নম্বর জাতীয় মহাসড়কের মোড়ে এই দৈত্যাকার ভাস্কর্যটি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কাতারের ফাইনালের এক আইকনিক মুহূর্তে মেসিকে এখানে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে: তার দৃষ্টি আকাশের দিকে, এক হাত তার প্রয়াত দাদীর উদ্দেশে উৎসর্গ করা চিরচেনা ভঙ্গিতে তোলা এবং হাঁটুর মাঝে ধরা স্বপ্নের বিশ্বকাপ। তার বুকে তিনটি তারকা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, যা ‘আলবিসেলেস্তে’দের তিনটি বিশ্ব শিরপাকেই নির্দেশ করে।
পর্যটকের খুব একটা দেখা না পাওয়া এই স্তেপ অঞ্চলের শিল্প-শহরে এমন মূর্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এর উত্তর রয়েছে আঞ্চলিক অর্থনীতির বাস্তবতায়। পাতাগোনিয়ার মনোরম লেক সংলগ্ন এলাকাগুলোর তুলনায় কুত্রাল-কো সবসময়ই শুধুমাত্র তেল উত্তোলনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পৌর কর্তৃপক্ষের আশা, ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে এই বিশাল মূর্তিটি পর্যটকদের যাত্রা বিরতি নিতে বাধ্য করবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আনবে, যার ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।
এর পেছনে একটি গভীর সামাজিক বার্তাও রয়েছে। যখন আর্জেন্টিনা জাতীয় দল ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঠে লড়ছে এবং ৩৯ বছর বয়সী লিও একের পর এক নতুন রেকর্ড গড়ছেন, তখন দেশটি এক কঠিন অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানের এই টালমাটাল সময়ে মেসির ব্যক্তিত্বই সম্ভবত আর্জেন্টিনার প্রতিটি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরের মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাখার একমাত্র মাধ্যম।
একটি বিশাল ভাস্কর্য কি অবহেলিত কোনো শহরের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে? হয়তো পুরোপুরি নয়। তবে এই স্থাপনাটি জাতীয় পরিচয়ের একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ, যা ভবিষ্যতে বিশ্বের লাখ লাখ ভক্তের কাছে এই শিল্পাঞ্চলকে এক তীর্থস্থানে পরিণত করতে পারে। কলকাতার সেই ২১ মিটারের নড়বড়ে ভাস্কর্যটি বাতাসের চাপে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এই বসন্তেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে প্রকৌশলীরা আশ্বস্ত করেছেন যে, পাতাগোনিয়ার এই বিশালাকার মূর্তিটি যেকোনো বড় ঝড় মোকাবিলায় সক্ষম, ঠিক যেমন মেসির অজেয় উত্তরাধিকার।

