ইউরোপ এবং অন্যান্য অনেক দেশে জন্মহার হ্রাসের কারণ কেবল আবাসন খরচ, অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনই নয়, বরং স্মার্টফোন যেভাবে তরুণ প্রজন্মের দৈনন্দিন জীবনকে নতুন করে সাজিয়েছে সেটিও একটি বড় প্রভাবক। ফিনান্সিয়াল টাইমস এবং ইউরোনিউজের বরাতে নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব অঞ্চলে মোবাইল ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের ব্যবহার আগে শুরু হয়েছে, সেখানে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে জন্মহার দ্রুতগতিতে কমেছে।
গবেষণায় যা উঠে এসেছে
ইউনিভার্সিটি অফ সিনসিনাটির গবেষক নাথান হাডসন এবং এরনান মস্কোসো বোয়েডো বিশ্বের ১২৮টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন এবং স্মার্টফোন ও ফোর-জি (4G) নেটওয়ার্কের বিস্তারের সাথে জন্মহারের পরিবর্তনের তুলনা করেছেন। তারা সময়ের একটি নির্দিষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন: ২০০৭ সালের পর থেকে অর্থাৎ প্রথম আইফোনের যুগ শুরু হওয়ার পর থেকে অনেক দেশেই ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে জন্মহার নাটকীয়ভাবে কমতে শুরু করে। ইউরোনিউজে প্রকাশিত তথ্যানুয়ায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের প্রজনন হার ৭১% এবং ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে ৪৩% হ্রাস পেয়েছে।
কেন এমন ঘটছে
গবেষকরা অবশ্য দাবি করছেন না যে স্মার্টফোন নিজেই সরাসরি সন্তানদের ‘বাতিল’ করে দিচ্ছে। তাদের প্রধান সিদ্ধান্ত হলো: ডিজিটাল পরিবেশ সরাসরি সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেয়, আর এই সরাসরি যোগাযোগই প্রায়শই নতুন পরিচয়, সম্পর্ক এবং কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ক্ষেত্র তৈরি করে। ইউরোনিউজে উল্লেখিত 'আমেরিকান টাইম ইউজ সার্ভে'-র তথ্যানুসারে, মার্কিন কিশোর-কিশোরীরা একে অপরের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কাটানো সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে: ২০০৩ সালে যেখানে দৈনিক ৬৮ মিনিট সরাসরি যোগাযোগ হতো, ২০১৯ সালে তা মাত্র ৩৮ মিনিটে নেমে এসেছে, অথচ ডিজিটাল বিনোদনের পেছনে ব্যয় করা সময় ২২ মিনিট থেকে বেড়ে ৯৬ মিনিটে পৌঁছেছে।
ইউরোপের জন্য এর অর্থ কী
ইউরোপও এই বৈশ্বিক প্রবণতা অনুসরণ করছে: ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রায় ৩৫.৫ লক্ষ শিশু জন্মগ্রহণ করেছে এবং গড় জন্মহার ছিল ১.৩৪, যা জনসংখ্যা স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় হারের চেয়ে লক্ষণীয়ভাবে কম। ইউরোনিউজের তথ্যমতে, জার্মানিতে ২০২৪ সালে জন্মহার ছিল ১.৩৫ এবং ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্যগুলো এর আরও অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মাঝেই সন্তান ধারণের ইচ্ছা এখনো ফুরিয়ে যায়নি: বিআইবি (BiB)-র গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, গড়ে নারীরা ১.৭৬টি এবং পুরুষরা ১.৭৪টি সন্তান জন্ম দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখেন।
স্মার্টফোনের ভূমিকা কতটা জোরালো
বিষয়টি খুব বেশি বাড়িয়ে দেখা ঠিক হবে না: স্মার্টফোনই জনতাত্ত্বিক পতনের একমাত্র কারণ নয়। জন্মহারের ওপর আবাসন, আয়, মুদ্রাস্ফীতি, পারিবারিক নীতি, কর্মসংস্থানের পরিবেশ এবং ভবিষ্যতের সামগ্রিক অনিশ্চয়তা এখনো বড় প্রভাব বিস্তার করে। তবে নতুন এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যোগ করেছে: ডিজিটাল অভ্যাসগুলো আগে থেকেই চলে আসা পতনকে আরও গতিশীল করতে পারে, বিশেষ করে কিশোর এবং তরুণদের ক্ষেত্রে, যাদের ঘনিষ্ঠতা, সম্পর্ক এবং শুরুর দিকের গর্ভধারণের সিদ্ধান্তগুলো দৈনন্দিন যোগাযোগের কাঠামোর ওপর অত্যন্ত সংবেদনশীল।
নিবন্ধের সারসংক্ষেপ
এই বিষয়ের মূল সারকথা হলো, স্মার্টফোন সরাসরি জন্মহার 'ধ্বংস' করছে না বরং এটি সেই সামাজিক বুননকেই বদলে দিচ্ছে যেখান থেকে দম্পতি ও পরিবার তৈরি হয়। সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ যত কমবে এবং পর্দার সামনে সময় কাটানোর পরিমাণ যত বাড়বে, স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা তত কঠিন হয়ে পড়বে—আর ফলস্বরূপ সন্তান জন্মদানের সুযোগও সীমিত হয়ে আসবে। একারণেই স্মার্টফোনের বিষয়টি আজ আর কেবল মনোবিজ্ঞান বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি গুরুতর জনতাত্ত্বিক আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে।




