ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলেছে। উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিশ্বনেতাদের ওপর নির্ভরতা কাটাতে ইউরোপ সক্রিয়ভাবে নিজস্ব উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদন বৃদ্ধি করছে। ইউরোপীয় কমিশনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং নতুন উদ্যোগগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ব্রাসেলস ঠিক কীভাবে তাদের বাজার সুরক্ষা এবং স্থানীয় উৎপাদনকারীদের সহায়তা করার পরিকল্পনা করছে।
ক্রমবর্ধমান বাজার: ইউরোপ আসলে কী তৈরি করছে?
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইইউ-তে উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের বিক্রির পরিমাণ ৪১৪ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। তুলনামূলকভাবে, দশ বছর আগে ২০১৪ সালে এই অঙ্কটি ছিল ২৭৩ বিলিয়ন ইউরো। ফলে এই বাজারটি প্রতি বছর গড়ে ৪.৩% হারে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উৎপাদন কাঠামোর দিকে নজর দিলে দেখা যায় যে, ইউরোপে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়:
- ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ওষুধপত্র — যা মোট উৎপাদনের ২৯ শতাংশ।
- ইলেক্ট্রনিক্স এবং টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম — ২৩ শতাংশ।
- বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং পরিমাপ প্রযুক্তি — প্রায় ২১ শতাংশ।
নিজস্ব উৎপাদনের এই বিশাল পরিসংখ্যান সত্ত্বেও, ইউরোপ এখনও বাইরের দেশগুলোর সরবরাহের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ইইউ-তে আমদানিকৃত সমস্ত উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের অর্ধেকেরও বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন থেকে।
বাণিজ্য ভারসাম্য: কাদের সঙ্গে ইউরোপ লাভবান আর কাদের সঙ্গে লোকসানে?
বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যান এক আকর্ষণীয় চিত্র তুলে ধরেছে। ইউরোপের মোট উচ্চপ্রযুক্তি রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩১%) যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আরও ১০% করে রপ্তানি হয় চীন এবং যুক্তরাজ্যে।
তবে অংশীদারদের ওপর ভিত্তি করে ইইউ-এর বাণিজ্য ভারসাম্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়:
- চীনের সাথে বাণিজ্যে বিশাল ঘাটতি (যখন ইউরোপ বিক্রির চেয়ে কেনে বেশি) দেখা গেছে — ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ৯২ বিলিয়ন ইউরো। তাইওয়ান (১৯ বিলিয়ন ইউরো) এবং ভিয়েতনামের (২০ বিলিয়ন ইউরো) সাথে বাণিজ্যেও বড় ধরণের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে।
- অন্যদিকে, বাণিজ্যে উদ্বৃত্তের (যখন কেনার চেয়ে বিক্রি বেশি হয়) ক্ষেত্রে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এগিয়ে আছে — ৪৬ বিলিয়ন ইউরো। এছাড়া যুক্তরাজ্য (২৭ বিলিয়ন ইউরো) এবং তুরস্কের (১১ বিলিয়ন ইউরো) সাথেও ইতিবাচক ভারসাম্য বজায় রয়েছে।
নিজস্ব বাজার সুরক্ষা: খেলার নতুন নিয়ম
অন্যান্য দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং নিজস্ব উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে ইউরোপীয় কমিশন প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার লক্ষ্যে একটি বিশাল উদ্যোগের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
এর মূল লক্ষ্য হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো—যেমন কম্পিউটার চিপ উৎপাদন, ক্লাউড প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক পরিষেবা এবং ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার—এর উন্নয়ন ঘটানো। মাইক্রোচিপ তৈরি থেকে শুরু করে সফটওয়্যার উন্নয়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে সহায়তা প্রদান করা হবে।
সবচেয়ে কঠোর পরিবর্তনটি আসতে যাচ্ছে সরকারি কেনাকাটার (টেন্ডার) ক্ষেত্রে। নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে—যেমন প্রতিরক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা—ইউরোপের বাইরের কোম্পানিগুলো কার্যত কোনো সরকারি কার্যাদেশ পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
এটি ব্রাসেলস থেকে আসা একটি সরাসরি বার্তা: ইউরোপ তার নিজস্ব বাজার রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর, নিজস্ব প্রযুক্তির ওপর বাজি ধরছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে অন্যের উদ্ভাবনের ওপর আর নির্ভর করবে না।



