শব্দ আপাতদৃষ্টিতে কেবল তথ্য বহন করে এবং সুর তৈরি করে। কিন্তু ইপিএফএল (EPFL)-এর মাইক্রোবায়োরোবোটিক সিস্টেম ল্যাবরেটরির প্রকৌশলীরা দেখিয়েছেন যে, শব্দ তরঙ্গ সরাসরি গতির একটি ভৌত শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
গবেষকরা ক্ষুদ্রাকৃতির যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা আল্ট্রাসাউন্ডের প্রভাবে বাতাসে উড়তে পারে। এগুলোর মধ্যে কোনো ইঞ্জিন বা ব্যাটারি নেই: চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি বাইরে থেকে একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে আসে।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস (Science Advances)-এ।
অনুরণন যেভাবে ধাক্কায় পরিণত হয়
এই উদ্ভাবনের মূলে রয়েছে হেলমহোল্টজ রেজোন্যান্স (Helmholtz resonance) —এটি এমন একটি ভৌত প্রভাব, যা খালি বোতলের মুখে ফুঁ দিলে দেখা যায়। গহ্বরের ভেতরের বাতাস কাঁপতে শুরু করে এবং একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে শব্দকে জোরালো করে তোলে।
প্রকৌশলীরা গতি সৃষ্টির জন্য একই নীতি প্রয়োগ করেছেন। তারা থ্রিডি প্রিন্টারে নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা অনুযায়ী ফাঁপা রেজোনেটর বা অনুরণক তৈরি করেছেন। যখন সঠিক কম্পাঙ্কের শব্দ এই কাঠামোর ওপর পড়ে, তখন গহ্বরের ভেতরের বাতাসের কম্পন বহুগুণ বেড়ে যায়।
বাতাস একটি সরু ও নির্দেশিত স্রোত হিসেবে ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসে, আর ভেতরে ফিরে আসে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসের প্রবাহের এই অসামঞ্জস্যই ধাক্কা বা থ্রাস্ট তৈরি করে।
এভাবেই অদৃশ্য শব্দ তরঙ্গ যান্ত্রিক গতিতে রূপান্তরিত হয়।
উড়ন্ত প্রোটোটাইপগুলোর জন্য দলটি 40 কিলোহার্জ কম্পাঙ্কের আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করেছে—যা মানুষের শ্রবণসীমার বাইরে। আমরা নিয়ন্ত্রণকারী এই তরঙ্গ শুনতে পাই না, কিন্তু অণুবীক্ষণিক যন্ত্রের জন্য এটি শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।
কণা থেকে উড়ান
গবেষকরা দুটি ভিন্ন উড্ডয়ন নীতির ওপর ভিত্তি করে উড়ন্ত যন্ত্রের দুটি সংস্করণ তৈরি করেছেন।
প্রথম মাইক্রো-ফ্লাইয়ারটির ওজন মাত্র 150 মাইক্রোগ্রামনিচের দিকে মুখ করা তিনটি অ্যাকোস্টিক রেজোনেটর এমন ধাক্কা তৈরি করে, যা কাঠামোটিকে পৃষ্ঠতল থেকে উল্লম্বভাবে উপরে উঠতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয় প্রোটোটাইপটির ওজন 184 মাইক্রোগ্রাম এবং এটি দেখতে তিন-পাখাবিশিষ্ট হেলিকপ্টারের রোটরের মতো। পাখার গোড়ায় বসানো রেজোনেটরগুলো নির্দেশিত ধাক্কা তৈরি করে এবং কাঠামোটিকে প্রায় 13 000 আরপিএম (RPM) গতিতে ঘোরায়। পাখার এই ঘূর্ণনের ফলে অ্যারোডাইনামিক লিফট বা ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি হয়।
এভাবে, একই ভৌত নীতিকে দুটি ভিন্ন স্থাপত্যে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়েছে: সরাসরি উল্লম্ব উত্তোলনের জন্য এবং ঘূর্ণন গতির জন্য।
কম্পাঙ্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নৌকা
পানির উপরিভাগেও এই পরীক্ষাটি চালানো হয়েছে।
গবেষকরা একটি ক্ষুদ্রাকৃতির নৌকায় বেশ কয়েকটি রেজোনেটর বসিয়েছেন, যার প্রতিটি নির্দিষ্ট শব্দ কম্পাঙ্কের জন্য টিউন করা ছিল। বিভিন্ন গহ্বর সক্রিয় করার মাধ্যমে নৌকাটিকে সামনে এগিয়ে নেওয়া এবং দিক পরিবর্তন করানো সম্ভব হয়েছে।
এটি এই উদ্ভাবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য: কাঠামোর পৃথক অংশগুলোকে নির্বাচন করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একটি শব্দ তরঙ্গ পুরো জায়গা দিয়ে প্রবাহিত হলেও, কেবল সেই রেজোনেটরটিই সাড়া দেয় যেটি সেই নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে টিউন করা থাকে।
কার্যত, কম্পাঙ্কটিই হয়ে ওঠে চলাচলের তারবিহীন নির্দেশ।
এটি কেবল ধারণার প্রমাণ
প্রযুক্তিটি এখনও প্রাথমিক পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। মাইক্রো-ফ্লায়ারগুলো মাত্র কয়েক মিলিমিটার উপরে উঠতে পারে এবং এখনও কোনো ভার বহন করতে সক্ষম নয়।
শক্তিও যন্ত্রের ভেতরে তৈরি হয় না—এটি বাইরের কোনো লাউডস্পিকার বা আল্ট্রাসাউন্ড ইমিটার থেকে আসে। তাই এগুলো কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ ড্রোন নয়, বরং চলাচলের একটি নতুন নীতির প্রমাণ।
তবে, অনবোর্ড ইঞ্জিন, তার এবং ব্যাটারির অনুপস্থিতি এমন ক্ষেত্রে সুবিধাজনক হতে পারে যেখানে আকার এবং ওজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে, অ্যাকোস্টিক রেজোনেটরগুলো মাইক্রোরোবোটিক্সে, দুর্গম গহ্বর অনুসন্ধানে, সূক্ষ্ম উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এবং ছোট বা ভঙ্গুর বস্তুর স্পর্শহীন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হতে পারে।
পদার্থ, যা তার নিজস্ব কম্পাঙ্ক শুনতে পায়
এখানে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় কেবল তৈরি করা যন্ত্রগুলোর অণুবীক্ষণিক আকার নয়। এটি হলো কোনো নির্দিষ্ট আকৃতির একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক গ্রহণ করার এবং সেই কম্পনকে নির্দেশিত গতিতে রূপান্তর করার ক্ষমতা।
একই শব্দ তরঙ্গ ল্যাবরেটরির বাতাস দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু কেবল সেই কাঠামোই সাড়া দেয়, যা তার রেজোন্যান্স কম্পাঙ্কে টিউন করা থাকে। বাকিগুলো স্থির থাকে।
এই আবিষ্কারে প্রযুক্তি প্রকৃতির অন্যতম মৌলিক নীতির সংস্পর্শে আসে: এখানে কেবল প্রভাবের শক্তিই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং তরঙ্গ এবং তা গ্রহণকারী আকারের মধ্যে সামঞ্জস্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আকার শব্দের সাথে মিলিত হয়।
শব্দ তার মধ্যে নিহিত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে।
এবং পদার্থ গতিশীল হয়ে ওঠে।
এভাবেই ধীরে ধীরে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণা পরিবর্তিত হচ্ছে। আমরা কেবল প্রতিটি যন্ত্রের ভেতরে শক্তির উৎস স্থাপন করতেই শিখছি না, বরং এমন আকার তৈরি করতেও শিখছি যা চারপাশের পরিবেশ থেকে শক্তি গ্রহণ করতে সক্ষম।
কখনও কখনও, ডানা মেলার জন্য পদার্থের বাড়তি শক্তির প্রয়োজন হয় না। তার প্রয়োজন হয় কেবল নিজের কম্পাঙ্ককে খুঁজে পাওয়া।




