জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সুদূর মহাকাশের একটি গ্যালাক্সিতে সক্রিয় ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর খুঁজে পাওয়ার আশা করেছিলেন, কিন্তু এর পরিবর্তে তারা সেখানে উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন নিউট্রিনোর এক শক্তিশালী উৎসের সন্ধান পেয়েছেন, যা মূলত চরম পর্যায়ের নক্ষত্র গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ‘শ্যাডো ব্লাস্টার’ (Shadow Blaster) ডাকনামের JCMT0402−0424 গ্যালাক্সিটি IC 210922A নামক নিউট্রিনোর উৎস হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যা ২০২১ সালে আইসকিউব (IceCube) অবজারভেটরি শনাক্ত করেছিল। এই আবিষ্কারটি প্রথমবারের মতো সরাসরি একটি ধূলিকণাপূর্ণ নক্ষত্র গঠনকারী গ্যালাক্সিকে নির্দিষ্ট নিউট্রিনো ঘটনার সাথে সম্পর্কিত করেছে এবং মহাবিশ্বের কোন বস্তুগুলো এই রহস্যময় কণা তৈরি করে তা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
Descubren a Shadow Blaster, la galaxia lejana que dispara neutrinos fantasma tutiempo.net/noticias/descu…
তাইওয়ানের মিটস সায়েন্স কোম্পানি লিমিটেডের (MITOS Science Co., LTD.) ইউজি উরাতার নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক দল আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত আলমা (ALMA) টেলিস্কোপের সাহায্যে এই পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন, যেখানে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি, চুং ইউয়ান ইউনিভার্সিটি, তোহোকু ইউনিভার্সিটি, ফুকুই ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি এবং জাপানের ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরির গবেষকরা যুক্ত ছিলেন। সামনের একটি গ্যালাক্সির মহাকর্ষীয় লেন্সিং আলমা-কে শ্যাডো ব্লাস্টারের চারটি অত্যন্ত বিবর্ধিত ছবি তুলতে সাহায্য করেছে।
গ্যালাক্সিটি প্রায় ১১ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত (রেডশিফট z = ২.৯৮৮), যার অর্থ এর আলো এমন এক সময় থেকে আমাদের কাছে পৌঁছেছে যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল মাত্র তিন বিলিয়ন বছর—এই সময়কালকে ‘কসমিক নুন’ (cosmic noon) বলা হয় যখন মহাবিশ্বে নক্ষত্র জন্মের হার ছিল তুঙ্গে। শ্যাডো ব্লাস্টারের মাত্র ১৫০০–১৭০০ আলোকবর্ষ বিস্তৃত কম্প্যাক্ট কেন্দ্রটি গ্যাস এবং ধূলিকণার এক অত্যন্ত ঘন ভাণ্ডার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে প্রতি বছর শত শত সৌর ভরের সমান হারে নক্ষত্র জন্ম নিচ্ছে—যা আমাদের গ্যালাক্সির নক্ষত্র গঠনের হারের চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি।
প্রাপ্ত তথ্যে সক্রিয় ব্ল্যাক হোল কেন্দ্রের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। নক্ষত্র তৈরির এই বিশাল ‘চুল্লিতে’ ঘন গ্যাসের সাথে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষ থেকে শক্তি উৎপন্ন হয়—আর সেখানেই নিউট্রিনোর জন্ম হয়। তাত্ত্বিক মডেলগুলো দীর্ঘকাল ধরেই পূর্বাভাস দিয়ে আসছিল যে, এ ধরনের চরম পরিবেশ প্রাকৃতিক কণা ত্বরক বা পার্টিকেল এক্সিলারেটর হিসেবে কাজ করে: যেখানে শক্তিশালী কণাগুলো জট পাকানো চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে গ্যাসের সাথে বারবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে নিউট্রিনো তৈরি করে। আগে ধারণা করা হতো যে, উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন নিউট্রিনোগুলো মূলত সক্রিয় গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা অতিভারী ব্ল্যাক হোলগুলো তৈরি করে; এখন এটি পরিষ্কার যে, ধূলিময় গ্যালাক্সির ভেতরে লুকিয়ে থাকা নক্ষত্রের বিস্ফোরণগুলোও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য এবং আগে অবমূল্যায়িত অবদান রাখে।
কম্পিউটার সিমুলেশন দেখায় যে, কসমিক নুন যুগের এই ধরনের কম্প্যাক্ট এবং ধূলিময় গ্যালাক্সিগুলো মহাবিশ্বের মোট উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন নিউট্রিনো প্রবাহের ১৫ থেকে ২০ শতাংশের উৎস হতে পারে। এটি প্রধান উৎস না হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এবং সবচেয়ে বড় কথা, এই আবিষ্কারের আগে এটি সরাসরি পর্যবেক্ষণ থেকে আড়ালেই ছিল। ঐতিহাসিকভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিউট্রিনো উৎসের সন্ধানে উজ্জ্বল সক্রিয় কেন্দ্র এবং গামা-রশ্মি বিস্ফোরণের ওপর মনোনিবেশ করেছিলেন, ফলে ধূলিময় নক্ষত্র গঠনকারী সিস্টেমের এই বিশাল সংখ্যাটি লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে গিয়েছিল। এই আবিষ্কার মহাজাগতিক কণা তৈরির গোপন প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে।
গবেষণার ফলাফলগুলো ২০২৬ সালের ১৭ জুন ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’ (Nature Astronomy) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। চিলির আলমা এবং অ্যান্টার্কটিকার আইসকিউব সম্মিলিতভাবে প্রমাণ করেছে যে: মহাজাগতিক নিউট্রিনোর উৎপত্তি বুঝতে হলে আমাদের শুধু ব্ল্যাক হোলের দিকে তাকালে চলবে না, বরং ধূলিকণার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদি মহাবিশ্বের সেই উত্তাল নক্ষত্রশালাগুলোর দিকেও নজর দিতে হবে, যা সম্ভবত প্রকৃত কণা তৈরির কারখানা।

