মধ্য আটলান্টিকের স্বল্প পরিচিত ডলড্রামস মেগাট্রান্সফর্ম অ্যান্ড ফ্র্যাকচার জোনে গবেষণা জাহাজ আর/ভি ফ্যালকর (টু)-এর ৩৫ দিনের অভিযানের সময় গবেষকরা সমুদ্রতলের ভূতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে গবেষণার আশা করেছিলেন।
তবে অতল সমুদ্র যেন তার ঝুলিতে আরও একটি বিস্ময়কর উপহার লুকিয়ে রেখেছিল।
প্রায় ৭১০ মিটার গভীরে সুবাস্টিয়ান নামক গভীর সমুদ্রের রোবটিক যানের ক্যামেরায় প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিক পরিবেশে বিরল প্রজাতির ব্যারেলাই বা উইন্টারিয়া টেলিস্কোপ মাছ ধরা পড়ে, যা এর আগে কখনও তার নিজস্ব আবাসে জীবন্ত অবস্থায় দেখা যায়নি।
ব্যারেলাই বা ম্যাক্রোপিন্না মাইক্রোস্টোমা হলো পৃথিবীর গভীর সমুদ্রের অন্যতম অদ্ভুত এক মাছ।
এর স্বচ্ছ মস্তক যেন দৃষ্টির সাথে প্রতারণা করে। অধিকাংশ মানুষ যেগুলোকে চোখ বলে মনে করেন, সেগুলো আসলে সামান্য নাসারন্ধ্র মাত্র। আসল চোখ দুটি ওই স্বচ্ছ গম্বুজের ভেতরেই লুকানো থাকে।
এগুলো দেখতে দুটি পান্না-সবুজ রঙের টেলিস্কোপের মতো, যা প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের দৃষ্টির অভিমুখ পরিবর্তন করতে পারে।
মূলত শরীরের এমন অভাবনীয় গঠনের কারণেই ব্যারেলাই সমুদ্রের এমন সব দৃশ্য দেখতে পায়, যা অধিকাংশ গভীর সমুদ্রের প্রাণীর দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়।
সমুদ্রের গোধূলি অঞ্চলে অনুভূমিকভাবে সাঁতার কাটার সময় ব্যারেলাই তার স্বচ্ছ মস্তকাবরণের মধ্য দিয়ে কেবল উপরের দিকেই তাকিয়ে থাকে, যাতে ওপর থেকে চুঁইয়ে আসা মৃদু আলোয় শিকারের ছায়া শনাক্ত করা যায়।
আর ঠিক আক্রমণের মুহূর্তেই তার চোখগুলো মসৃণভাবে সামনের দিকে ঘুরে যায়, যা নির্ভুলভাবে শিকার ধরতে সাহায্য করে।
বিবর্তন মাঝে মাঝে এতটাই সুনিপুণ হয় যে, একে আস্ত একটি শিল্পকর্ম বলে মনে হতে থাকে।
ব্যারেলাই সমুদ্রের ৬০০-৮০০ মিটার গভীরে বিচরণ করে, যেখানে দিনের আলো প্রায় অন্ধকারের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়।
এর চোখের হলুদ রঞ্জক পদার্থ সূর্যের অবশিষ্ট আলো আর সমুদ্রের এই গোপন জগতের বিচ্ছুরিত আলোকচ্ছটার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে।
তবে আসল বিস্ময়ের শুরু এখানেই নয়। বিজ্ঞানীরা ১৯৩৯ সালেই প্রথম এই মাছের বর্ণনা দিলেও এর দৃষ্টিশক্তির কৌশল দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এক অমীমাংসিত রহস্য ছিল।
গভীর সমুদ্র থেকে ওপরে তোলার সময় বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তনের কারণে মাছটির স্বচ্ছ গম্বুজটি ধ্বংস হয়ে যেত, ফলে এর শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে অনন্য অংশটি অজানাই থেকে যেত।
অবশেষে ২০০৪ সালে যখন গভীর সমুদ্রের সক্ষম যন্ত্রপাতির মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশে মাছটিকে জীবন্ত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়, তখনই এই রহস্যের জট খুলতে শুরু করে।
সমুদ্রের ২০০ থেকে ১০০০ মিটারের মধ্যবর্তী এই গোধূলি অঞ্চলটিতে শত শত প্রজাতি এমন সব প্রাকৃতিক নিয়মে বেঁচে থাকে, যা আমরা কেবল বুঝতে শুরু করেছি।
প্রতিটি অভিযান কেবল নতুন কিছু তথ্যই সংগ্রহ করে না। এটি বরং আমাদের জানার পরিধি ও সম্ভাবনার মানচিত্রকেও আরও বিস্তৃত করে।
আর মাঝে মাঝে একটি ছোট গভীর সমুদ্রের মাছের স্বচ্ছ মাথার গম্বুজটি কেবল তার অসাধারণ বিবর্তনকেই তুলে ধরে না।
এটি আমাদের নিজেদের অর্জিত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকেও আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে।
সম্ভবত এই গভীর রহস্যময় জগত আমাদের এ কারণে এত বেশি টানে। এটি এই জন্য নয় যে সমুদ্র সেখানে সব উত্তর লুকিয়ে রেখেছে।
বরং এটি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয় বলেই আমরা এর প্রতি চিরকাল মোহগ্রস্ত থাকি।
আর সম্ভবত জীবনের অন্যতম সুন্দর বৈশিষ্ট্য এখানেই নিহিত।
জীবন আমাদের বিস্মিত করতে কখনও ক্লান্ত হয় না।
এটি কেবল ধৈর্য ধরে সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করে, যখন আমরা একে আরও গভীরতর দৃষ্টিতে দেখার জন্য প্রস্তুত হব।



