বর্তমানে দক্ষিণ ইউরোপে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ চলছে এবং সরকারগুলো জরুরিভিত্তিতে নজিরবিহীন সব ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। মহাদেশজুড়ে তাপমাত্রার এক বিপজ্জনক মাত্রা তৈরি হয়েছে, যা কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এবং কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে।
ফ্রান্সে পরিস্থিতি এখন সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো দেশের ৯৬টি বিভাগের মধ্যে ৩৫টিতে চরম সতর্কবার্তা বা 'রেড অ্যালার্ট' জারি করা হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করেছে যে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে প্যারিস হয়ে বারগান্ডি অঞ্চল পর্যন্ত ৩৯ থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে।
এক জরুরি বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লিকর্নু একটি ঐতিহাসিক ডিক্রি জারি করেছেন: চরম সতর্কতার অধীনে থাকা অঞ্চলগুলোতে আগামী ২১ শে জুন বার্ষিক সংগীত উৎসব ‘ফেত দে লা মিউজিক’ এবং অন্যান্য জনসমাগমস্থলে প্রকাশ্যে মদ বিক্রি ও পান করা নিষিদ্ধ থাকবে। সংগীতের অনুষ্ঠানগুলো বাতিল করা না হলেও, লোকজনকে এখন নেশামুক্ত অবস্থাতেই উৎসব উপভোগ করতে হবে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি সহজ যুক্তি রয়েছে: প্রচণ্ড গরমে অ্যালকোহল সেবন শরীরের ঘাম হওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং বিপজ্জনকভাবে পানিশূন্যতা তৈরি করে। কর্তৃপক্ষ মৃত্যুহার বৃদ্ধি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়তি চাপের আশঙ্কা করছেন। ২১ শে জুনের জন্য প্যারিস এবং ইল-দ্য-ফ্রান্স অঞ্চলে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে—যা সুস্থ ব্যক্তি সহ পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য একটি চরম ঝুঁকির সংকেত। নাগরিকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে ফরাসি রাজধানীর উদ্যান এবং বাগানগুলো চব্বিশ ঘণ্টা খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জার্মানিতে আবহাওয়া সংস্থা ডিডব্লিউডি (DWD) প্রায় সারা দেশেই সতর্কতা জারি করেছে। সেখানে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে, আর গরম ও আর্দ্রতার বিপজ্জনক সংমিশ্রণ প্রবল বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি এবং বন্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বায়ুমণ্ডলে এমন শক্তি সঞ্চিত হয়েছে যা স্থানীয়ভাবে তীব্র এবং বিপজ্জনক ঝড় ঘটাতে সক্ষম।
ইতালিতে থার্মোমিটারের পারদ ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে গেছে। রোমে পর্যটকরা কিছুটা শীতলতার আশায় কলোসিয়াম বা ক্লডিয়াস মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের নিচে ছায়ার খোঁজ করছেন। বোলোগনায় অসহ্য গরম থেকে বাঁচতে একদল তরুণকে নেপচুন ফোয়ারার কাছে একে অপরের দিকে জল ছুড়তে দেখা গেছে।
স্পেনে ফুটবল ফেডারেশন মাদ্রিদের প্লাজা দে কোলন এলাকায় অবস্থিত দেশের প্রধান ‘ফ্যান-জোন’ বন্ধ করে দিয়েছে। দর্শকরা খোলা আকাশের নিচে বড় পর্দায় স্পেন বনাম সৌদি আরবের ম্যাচ দেখার সুযোগ পাবেন না। ঘন ভিড়ের মধ্যে হিট স্ট্রোক এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি এতটাই বেশি ছিল যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা একমত যে, জলবায়ুর ওপর মানুষের ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে এ ধরনের তাপপ্রবাহ এখন আরও ঘনঘন এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এই গ্রীষ্মেই চরম দাবদাহ স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলার হুমকি দিচ্ছে। তীব্র গরম অবকাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে: এয়ার কন্ডিশনারের চাহিদার কারণে বিদ্যুৎ সংযোগের ওপর চাপ পড়ছে, রেললাইনের পাত গরমে বেঁকে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা কল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
ব্যাংক অব ফ্রান্সের গভর্নর ইমানুয়েল মৌলিন এই পরিস্থিতির স্বল্পমেয়াদী প্রভাবের একটি বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন: এর ফলে শ্রমের উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে, অথচ ঘর ঠান্ডা রাখার জন্য বিদ্যুতের বিল আকাশচুম্বী হচ্ছে। মধ্যমেয়াদী বিচারে তাপপ্রবাহ নিশ্চিতভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধীর করে দেয় এবং বিনিয়োগ ও খরচ কমিয়ে দেয়। এটি কেবল নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়—বরং ইউরোপীয় অর্থনীতির জন্য এক প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি।
মহাদেশটিকে আরও কত সপ্তাহ বা মাস এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে? আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এই উষ্ণতার বলয় বা ‘হিট ডোম’ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।



