২০২৬ সালের ৫ জুন বিশ্বজুড়ে মুক্তি পেয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত ফ্যান্টাসি ব্লকবাস্টার 'মাস্টার্স অফ দ্য ইউনিভার্স'। ইউরোপীয় দর্শকরা ৪ এবং ১১ জুন প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি দেখার সুযোগ পান। পরিচালক ট্র্যাভিস নাইট এবং অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিও এই কাল্ট ক্লাসিকের একটি নতুন অধ্যায় উপহার দিয়েছে। এটি এমন এক দৃশ্যকাব্য যা তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৯৩ বছরের বৃদ্ধ—সবার জন্যই সমান আকর্ষণীয়।
গল্পের শুরুতে দেখা যায় দশ বছর বয়সী রাজকুমার অ্যাডামকে, যে তার জন্মভূমি ইটারনিয়া থেকে দূরে পৃথিবীতে এসে বড় হয়। দীর্ঘ পনের বছর পর সে যখন নিজের গ্রহে ফিরে আসে, তখন দেখে সেটি শক্তিশালী স্কেলেটরের দখলে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এখন অ্যাডামকে তার ভাগ্য মেনে নিতে হবে এবং নিজের অভ্যন্তরীণ শক্তি অর্জন করে মহাবিশ্বের রক্ষক 'হি-ম্যান' হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে।
এই চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিকোলাস গালিটজিন (হি-ম্যান/রাজকুমার অ্যাডাম), জ্যারেড লেটো (স্কেলেটর), ক্যামিলা মেন্ডেস (টিলা) এবং ইদ্রিস এলবা (ডানকান/আর্মস মাস্টার)। প্রতিটি অভিনেতা কেবল তাদের চরিত্রে অভিনয় করেননি, বরং তাদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করেছেন। তারা রূপকথার নায়কদের দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জীবন্ত এবং আপন করে তুলেছেন।
সিনেমাটি সব বয়সের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার একটি বড় কারণ হলো এর বহুমুখী আবেদন। শিশুদের জন্য এটি একটি রঙিন অ্যাডভেঞ্চার, যেখানে রয়েছে সাহসী চরিত্র, গতিশীল যুদ্ধ এবং বন্ধুত্ব ও আত্মবিশ্বাসের এক সহজ গল্প। এর স্পেশাল ইফেক্টগুলো মুগ্ধকর এবং চরিত্রগুলো দীর্ঘকাল মনে রাখার মতো।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই সিনেমাটি নস্টালজিয়া এবং গভীরতার এক চমৎকার সংমিশ্রণ। রূপকথার আবরণে এখানে দায়িত্ববোধ, সঠিক পছন্দ এবং ঘরের গুরুত্বের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমাটি গম্ভীর বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করলেও এর মধ্যে হাস্যরস এবং এক ধরনের হালকা মেজাজ চমৎকারভাবে বজায় রাখা হয়েছে।
চমৎকার স্পেশাল ইফেক্ট, রঙিন চরিত্র, দুর্দান্ত কস্টিউম এবং প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় মূল গল্পের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তৈরি করা হয়েছে। সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যই যেন একটি ভিজ্যুয়াল ট্রিট। এর কাহিনী যেমন জাদুকরী, তেমনি রোমাঞ্চকর, যা দর্শকদের প্রতিটি মোড়ে কৌতূহলী করে রাখে।
সিনেমার সংলাপগুলো বেশ মনে রাখার মতো এবং দর্শকদের অনেক আনন্দ দেয়। যেমন একটি দৃশ্যে যখন সামরিক কাউন্সিলের কথা বলা হয়, তখন নিকোলাস গালিটজিন রসিকতা করে বলেন, এটি কাউন্সিল নয় বরং একটি সেমিনার। এই ধরনের হালকা ও বিদ্রূপাত্মক সংলাপ সিনেমার গম্ভীর আবহকে সহজ করে তোলে।
সংলাপের বৈচিত্র্য এখানে লক্ষ্যণীয়। যেমন এক জায়গায় বলা হয়, মুখোমুখি লড়াই করো, যার উত্তরে খলনায়ক বলে, প্রথমত আমার কোনো মুখ নেই। আবার ঐক্যের গুরুত্ব বোঝাতে বলা হয়, একতাতেই সব শক্তি এবং আমরা সবাই মিলে আমাদের ঘর ফিরে পাবো। এই কথাগুলো দর্শকদের অনুপ্রাণিত করে।
সিনেমার সাউন্ডট্র্যাকে ফ্রেডি মার্কারির গান ব্যবহার করা হয়েছে, যা নাটকীয় মুহূর্তগুলোকে আরও আবেগঘন এবং শক্তিশালী করে তুলেছে। এই সঙ্গীত কেবল দৃশ্যগুলোকে অনুসরণ করে না, বরং দর্শকদের আবেগকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে বিজয়ের মুহূর্তগুলো এই সঙ্গীতের কারণে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
ভক্তদের জন্য কিছু বিশেষ তথ্য রয়েছে যা তাদের আনন্দ দেবে। পৃথিবীতে থাকাকালীন রাজকুমার অ্যাডাম গ্লেন পদবি ব্যবহার করেন। এটি ১৯৮৩ সালের ক্লাসিক অ্যানিমেটেড সিরিজের একটি রেফারেন্স, যেখানে অ্যাডামের মা ছিলেন পৃথিবীর মহাকাশচারী মার্লেনা গ্লেন।
পরিচালক ট্র্যাভিস নাইট চেয়েছিলেন স্কেলেটর চরিত্রে জ্যারেড লেটোর চেহারা যেন মেকআপ এবং প্রাকটিক্যাল ইফেক্টের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। কম্পিউটার গ্রাফিক্সের ব্যবহার ছিল নগণ্য, যা স্কেলেটরকে একই সাথে ভয়ংকর এবং মানবিক করে তুলেছে। এর ফলে চরিত্রটি আরও বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের এই সংস্করণে ক্রিস্টেন উইগ রোবোটো নামক যান্ত্রিক যোদ্ধার চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন। ফ্র্যাঞ্চাইজির ইতিহাসে এই প্রথম কোনো অ্যান্ড্রয়েড নারী কণ্ঠে কথা বলছে। উইগ এই চরিত্রে এক নতুন ধরনের উষ্ণতা এবং কৌতুক যোগ করেছেন, যা রোবোটোকে সিনেমার অন্যতম প্রিয় চরিত্রে পরিণত করেছে।
১৯৮৭ সালের হি-ম্যান ডলফ লুন্ডগ্রেনের উপস্থিতি ভক্তদের জন্য সবচেয়ে বড় চমক ছিল। তিনি জিমের একজন অভিজ্ঞ বডিবিল্ডার হিসেবে আবির্ভূত হন যেখানে তরুণ অ্যাডাম প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। লুন্ডগ্রেন তাকে বলেন, তুমি আমার জায়গায় আছো—যা নিকোলাস গালিটজিনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের একটি রূপক।
লুন্ডগ্রেন তরুণ নায়ককে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন যে, বাইরের শক্তির চেয়ে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা বেশি জরুরি। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি বলেন, শুভ যাত্রা—যা ১৯৮৭ সালের সিনেমার একটি সরাসরি উদ্ধৃতি। লুন্ডগ্রেন এই অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত আবেগঘন এবং পরাবাস্তব বলে বর্ণনা করেছেন।
১৯৮৭ সালের মূল সিনেমাটি সেই সময় ব্যবসায়িক সফল না হলেও কাল্ট মর্যাদা পেয়েছিল। নতুন সংস্করণটি পূর্বসূরিকে অন্ধভাবে অনুকরণ না করে বরং তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে প্রযুক্তি ও চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়েছে। এটি কেবল একটি রিবুট নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে একটি সার্থক সংলাপ।
সিনেমাটি দেখার অন্যতম কারণ হলো এর হাস্যরস, যা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়কেই সমানভাবে হাসায়। প্রতিটি যুদ্ধ দৃশ্য একটি ভিজ্যুয়াল উৎসবের মতো। এছাড়া গালিটজিন ও লেটোর মধ্যকার রসায়ন নায়ক ও খলনায়কের এক আদর্শ দ্বৈরথ তৈরি করেছে যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
মাস্টার্স অফ দ্য ইউনিভার্স কেবল একটি সাধারণ ব্লকবাস্টার নয়; এটি একটি গল্প যা শেখায় শক্তি কেবল পেশিতে নয়, বরং হৃদয়ে থাকে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে ঘর কেবল একটি মানচিত্রের স্থান নয়, বরং সেই মানুষগুলো যাদের জন্য লড়াই করা এবং জীবন দেওয়া সার্থক।
এমনকি মহাবিশ্বের সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও আলোর অস্তিত্ব থাকে। এটি এমন একটি চলচ্চিত্র যা বারবার দেখার ইচ্ছা জাগায় এবং প্রিয়জনদের সাথে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা।
সিনেমার মূল মন্ত্র হলো—মুখোমুখি লড়াই করো এবং একতাতেই শক্তি। যারা অলৌকিক ঘটনা, বন্ধুত্ব এবং ভালোর জয়ে বিশ্বাস করেন, তাদের জন্য এই সিনেমাটি অবশ্যই দেখার মতো। একটি মানসম্মত, আবেগপূর্ণ এবং দর্শনীয় চলচ্চিত্র হিসেবে এটি সবার মন জয় করে নেবে।



