ভিটামিন বি-১ বা থায়ামিন হলো আমাদের বিপাক প্রক্রিয়ার এক ‘নেপথ্য কারিগর’। এটি ছাড়া কোষগুলো খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে না এবং আমাদের স্নায়ুতন্ত্র কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তবে দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা বিতর্কে লিপ্ত ছিলেন: এই ক্ষুদ্র অণুটি আসলে কীভাবে জীবন্ত কোষের ভেতরে কাজ করে?
১৯৫৮ সালে রসায়নবিদ রোনাল্ড ব্রেসলো একটি ‘অদ্ভুত’ ধারণা প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি অনুমান করেছিলেন যে, ভিটামিন বি-১ মুহূর্তের জন্য কার্বিনে রূপান্তরিত হয়—যা ‘শূন্য’ বন্ধনযুক্ত কার্বনের অত্যন্ত সক্রিয় একটি রূপ। সমস্যাটি ছিল এই যে, কার্বিন এবং পানি একে অপরের চিরশত্রু। পানির উপস্থিতিতে কোনো বিক্রিয়া শুরু করার আগেই কার্বিনের তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। ব্রেসলোর তত্ত্বটি কাগজে-কলমে যুক্তিযুক্ত মনে হলেও বাস্তবে জৈবিকভাবে অসম্ভব বলে মনে হতো।
ইউসি রিভারসাইডের একটি দল এই বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে। তারা থায়ামিনের একটি সদৃশ অণু সংশ্লেষণ করেন এবং সেটিকে ক্লোরিনেটেড কার্বোরেন দিয়ে তৈরি একটি সুরক্ষামূলক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেন। এই ‘বর্মটি’ বিক্রিয়া কেন্দ্রের চারপাশে একটি শুষ্ক অঞ্চল তৈরি করেছিল, যার ফলে কার্বিনটি পানিতেও কয়েক মাস ধরে স্থিতিশীল থাকতে সক্ষম হয়। এই পরীক্ষাটি সফলভাবে প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃতি এমনভাবে শক্তিশালী রাসায়নিক সরঞ্জাম ব্যবহারের পথ খুঁজে নিয়েছে যেখানে প্রথাগত রসায়নের নিয়মানুযায়ী সেগুলোর অস্তিত্ব থাকাই অসম্ভব।
কেন এটি আমাদের প্রত্যেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ? বি-১ কার্বিন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে—এই উপলব্ধি ‘সবুজ রসায়ন’ বা পরিবেশবান্ধব রসায়ন তৈরির পথ প্রশস্ত করে। আগে যেখানে বিষাক্ত ভারী ধাতুর প্রয়োজন হতো, এখন সেখানে আমরা ভিটামিন-ভিত্তিক জৈব প্রভাবক ব্যবহার করতে পারব।
তাছাড়া, এটি ভিটামিনের তীব্র ঘাটতি এবং বিপাকীয় ব্যাধিগুলোর চিকিৎসার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে। এনজাইমের ‘বর্ম’ কীভাবে সক্রিয় কেন্দ্রকে রক্ষা করে তা জানতে পারলে, আমরা এমন ওষুধ তৈরি করতে পারব যা জেনেটিক ত্রুটির ক্ষেত্রেও এই সুরক্ষা ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, বিবর্তন টেস্ট টিউবের প্রচলিত নিয়মগুলোকে পাশ কাটাতে শিখেছে বলে আপনার শরীরে এখনই আরও কত ‘অসম্ভব’ বিক্রিয়া ঘটছে? মনে হচ্ছে, আমাদের সাহসী তত্ত্বগুলোর চেয়েও জীববিজ্ঞান অনেক বেশি দুঃসাহসী।
ব্রেসলোর ‘অসম্ভব’ তত্ত্বটির সারকথা কী?
ভিটামিন বি-১ (থায়ামিন) এর কো-এনজাইম (থায়ামিন ডাইফসফেট, TPP) রূপে বিপাক প্রক্রিয়ার মূল বিক্রিয়াগুলোতে অংশগ্রহণ করে:
- পাইরুভেটের ডিকার্বক্সিলেশন (অ্যাসিটাইল-CoA-তে রূপান্তর),
- পেন্টোজ ফসফেট পাথে কাজ করা,
- কিটোন বডি এবং ব্রাঞ্চড-চেইন অ্যামিনো অ্যাসিডের বিপাক।
ব্রেসলো প্রস্তাব করেছিলেন যে, থায়ামিন কেবল ‘সাধারণ’ কো-এনজাইম হিসেবে কাজ করে না, বরং সাময়িকভাবে একটি কার্বিন-সদৃশ মধ্যবর্তী পদার্থে (Breslow intermediate) রূপান্তরিত হয়। এই কার্বিন অত্যন্ত উচ্চ বিক্রিয়াশীল এবং এটি এনজাইমগুলোকে এমন সব বিক্রিয়া ঘটাতে সাহায্য করে যা কোষের জলীয় পরিবেশে অন্যথায় অত্যন্ত কঠিন হতো।
সমস্যা: সাধারণ কার্বিন পানির সাথে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রিয়া করে ধ্বংস হয়ে যায়। এ কারণে অনেক বিজ্ঞানীই ব্রেসলোর ধারণাটিকে ‘অসম্ভব’ এবং জৈবিক পরিবেশে অসাধ্য বলে মনে করতেন।
২০২৫ সালে কী অর্জন করা সম্ভব হয়েছে?
গবেষক দলটি একটি বিশেষ আণবিক পাত্র (ইমিডাজোলিয়ামের ওপর ভিত্তি করে) সংশ্লেষণ করেছে, যা কার্বিনকে পানির অণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এর ফলে:
- ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কার্বিনকে কেবল তৈরিই করা হয়নি, বরং তরল পানিতে একে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে।
- সেটিকে আলাদা করে টেস্ট টিউবে সিল করা হয়েছিল এবং কোনো প্রকার ক্ষয় ছাড়াই কয়েক মাস পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।
- স্পেকট্রোস্কোপি এবং অন্যান্য পদ্ধতির সাহায্যে এর গঠন নিশ্চিত করা হয়েছে।
এটিই ইতিহাসের জলীয় পরিবেশে প্রথম স্থিতিশীল কার্বিন।
এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মৌলিকভাবে—অবশেষে আমরা ভিটামিন বি-১ এর কাজ করার আণবিক পদ্ধতিটি সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছি। এটি জৈব রসায়নের পাঠ্যপুস্তক বদলে দেবে।
ব্যবহারিক দিক থেকে:
- ভিটামিন বি-১ এর অভাবজনিত রোগগুলো (বেরিবেরি, মদ্যপান বা ডায়াবেটিসজনিত স্নায়বিক সমস্যা ইত্যাদি) আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে।
- সবুজ রসায়ন এবং বায়োক্যাটালিসিসে নতুন দিগন্ত: পানিতে কার্বিনের ব্যবহার বিষাক্ত দ্রাবক ও প্রভাবকের বিকল্প হতে পারে।
- বিপাকীয় ব্যাধিগুলোর জন্য ভিটামিন বি-১ এর আরও কার্যকর সদৃশ অণু বা নতুন ওষুধ তৈরির সম্ভাবনা।
- কার্বিন রক্ষার এই পদ্ধতিটি অন্যান্য অতি-বিক্রিয়াশীল ইন্টারমিডিয়েটগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে যা আগে অধ্যয়ন করা সম্ভব হয়নি।
এটি একটি ধ্রুপদী উদাহরণ যেখানে সংশ্লেষণী রসায়নের উন্নতির ফলে ৬৭ বছর আগের একটি ‘অসম্ভব’ তত্ত্ব শেষ পর্যন্ত সত্য প্রমাণিত হয়েছে।



