অতিরিক্ত ওজন কমাতে যারা সেমাগ্লুটাইড (ওজেম্পিক এবং ওয়েগোভির সক্রিয় উপাদান) ব্যবহার করেছেন, তারা সবাই এক অদৃশ্য বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। প্রথম কয়েক মাস ওজন ধারাবাহিকভাবে কমলেও একটা সময় ওজন কমার প্রক্রিয়াটি অনিবার্যভাবে থমকে যায়। এতদিন একে শরীরের একটি স্বাভাবিক বিপাকীয় অভিযোজন—অর্থাৎ ওজন কমার ফলে শক্তির ব্যয় হ্রাস বলে মনে করা হতো—কিন্তু এর আসল কারণ আরও গভীর এবং তা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু কোষের ভেতরে লুকিয়ে আছে।
২০২৬ সালের মে মাসের শেষের দিকে, মার্কিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ (এনআইএইচ)-এর একটি গবেষক দল নেচার মেটাবলিজম সাময়িকীতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে, যা এই ওজন থমকে যাওয়ার প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিচ্ছে। উন্নত ফ্লোরোসেন্স মাইক্রোস্কোপি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা সেমাগ্লুটাইড প্রয়োগের সময় ইঁদুরের জীবন্ত নিউরনের ভেতরে কী ঘটে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ব্রেইনস্টেম বা মস্তিষ্কের কান্ডের ‘এরিয়া পোস্ট্রেমা’ নামক একটি অংশ, যা ক্ষুধা এবং তৃপ্তির অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই ওষুধের কার্যকারিতা সরাসরি কোষের অভ্যন্তরীণ বার্তাবাহক অণু—সিএএমপি (সাইক্লিক অ্যাডেনোসিন মনোফসফেট)-এর ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে। যখন সেমাগ্লুটাইড রিসেপ্টরগুলোকে সক্রিয় করে, তখন সিএএমপি-এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা মস্তিষ্ককে ক্ষুধা দমন করার সংকেত দেয়। তবে সব কোষের প্রতিক্রিয়া একরকম হয় না। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, কিছু নিউরন দ্রুত এই অভ্যন্তরীণ সংকেতটিকে স্তিমিত করে দেয়, যা ওজন কমা থমকে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু করে। কোষগুলো মূলত বাইরের ক্রমাগত উদ্দীপনা থেকে নিজেদের রক্ষা করতেই এমনটি করে থাকে।
এই বাধা কীভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব? ডক্টর ক্লেয়ার গাও-এর নেতৃত্বে এনআইএইচ-এর গবেষকরা কোষের ভেতরেই এর একটি সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে পেয়েছেন। সিএএমপি অণুকে ভেঙে ফেলার জন্য দায়ী হলো ফসফোডাইস্টেরেজ-৪ (পিডিই৪) নামক একটি প্রাকৃতিক এনজাইম। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আগে থেকেই পরিচিত একটি ইনহিবিটর (রোফ্লুমিলাস্ট) দিয়ে এই এনজাইমের কাজ বন্ধ করে বিজ্ঞানীরা নিউরনগুলোতে সেমাগ্লুটাইডের প্রতি সংবেদনশীলতা স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে তৃপ্তির সংকেত আর স্তিমিত হয়ে যায় না।
ভবিষ্যতে এই আবিষ্কার একটি সম্মিলিত চিকিৎসার পথ তৈরি করবে। সিএএমপি অণুর নিয়ন্ত্রণ কেবল ওজন থমকে যাওয়ার সমস্যাই সমাধান করবে না, বরং ইনজেকশনের প্রয়োজনীয়তাও কমিয়ে আনবে। মূল হরমোনজাতীয় ওষুধের ডোজ ক্রমাগত বাড়ানোর পরিবর্তে, চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন কোষের অভ্যন্তরীণ ‘সুইচ’গুলো সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ল্যাবরেটরির ইঁদুর থেকে ওষুধের দোকান পর্যন্ত পৌঁছাতে হয়তো আরও কয়েক বছর সময় লাগবে, তবে স্থূলতা প্রতিরোধের লড়াইয়ে এখন একটি সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া গেছে।




