আকাশগঙ্গা আরও প্রশস্ত: চন্দ্রা টেলিস্কোপের নতুন তথ্য ছায়াপথের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে

লেখক: Uliana S

আমাদের ছায়াপথটিকে কল্পনা করুন—এক বিশাল নক্ষত্রের আবর্তনশীল কুণ্ডলী, যার একটি বাহুতে অবস্থিত আমাদের সৌরজগত। আমরা অনেক দিন ধরেই জানি যে আকাশগঙ্গা একটি সর্পিল ছায়াপথ, কিন্তু ডিস্কের ভেতরে আমাদের অবস্থান হওয়ায় পৃথিবী থেকে এর গঠন নিখুঁতভাবে আঁকা অত্যন্ত কঠিন। ধুলো এবং গ্যাস দূরের বাহুগুলোকে আড়ালে রাখে, আর পরিমাপের অনেক পদ্ধতিই ছায়াপথের ঘূর্ণন গতির ধারণার ওপর নির্ভর করে। সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পেয়েছেন: বাইরের সর্পিল বাহুগুলো কেন্দ্র থেকে আগে যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়েও বেশি দূরে বিস্তৃত।

নাসার চন্দ্রা এক্স-রে টেলিস্কোপ এবং ইউরোপীয় এক্সএমএম-নিউটন (XMM-Newton)-এর সাহায্যে এই আবিষ্কারটি করা হয়েছে। ইতালির বিয়াত্রিচে ভাইয়া (Beatrice Vaia)-র নেতৃত্বাধীন একটি দল তথাকথিত 'আলোর প্রতিধ্বনি' বা লাইট ইকো নিয়ে গবেষণা করেছে—এগুলো মূলত এক্স-রে বিকিরণের বলয় যা আকাশগঙ্গার বাহুতে থাকা ধুলোর মেঘ থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসা দূরবর্তী গামা-রশ্মির বিস্ফোরণ থেকে তৈরি হয়। গামা-রশ্মির বিস্ফোরণ হলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি, যা বিশাল নক্ষত্রের ধ্বংস বা নিউট্রন নক্ষত্রের মিলনের ফলে ঘটে এবং এগুলো আমাদের ছায়াপথের অনেক বাইরে অবস্থিত।

যখন আলোর একটি শক্তিশালী স্পন্দন ছায়াপথের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন এর কিছু অংশ ধুলোর কণা দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয়। এক্স-রে পরিসরে এটি বিস্তৃত বলয় তৈরি করে, যার ব্যাস সরাসরি ধুলোর মেঘের দূরত্বের সাথে সম্পর্কিত। ধুলো আমাদের যত কাছে থাকে, বলয়টি তত বড় হয়। এই জ্যামিতিক পদ্ধতিটি ছায়াপথের ঘূর্ণন মডেলের ওপর তেমন নির্ভর করে না এবং এটি উচ্চ নির্ভুলতা প্রদান করে।

গবেষকরা তিনটি ভিন্ন গামা-রশ্মি বিস্ফোরণের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁরা তিনটি বাহুর দূরত্ব পরিমাপ করেছেন: পার্সিয়াস (Perseus), আউটার (Outer) এবং আউটার স্কুটাম-সেন্টোরাস (Outer Scutum-Centaurus)। দেখা গেছে যে সবচেয়ে দূরের দুটি বাহু ছায়াপথ কেন্দ্র থেকে আগে যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে প্রায় ১০% বেশি দূরে অবস্থিত। প্রথম নজরে পার্থক্যটি সামান্য মনে হলেও ছায়াপথের গঠন বোঝার জন্য এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

"এটি দূরত্ব পরিমাপের একটি অত্যন্ত সরাসরি পদ্ধতি, যা শুধুমাত্র জ্যামিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি," বিয়াত্রিচে ভাইয়া উল্লেখ করেছেন। আগে ছায়াপথের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে অনিশ্চয়তা বাড়ত কারণ ঘূর্ণন মডেলগুলো তখন কম নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠত। নতুন এই তথ্য আকাশগঙ্গার মোট ভরের হিসাব এবং এমনকি সর্পিল বাহুগুলো কীভাবে গঠিত ও টিকে থাকে সে সম্পর্কে ধারণাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা একটি দূরবর্তী ধূলিমেঘের প্রস্থও অনুমান করেছেন—যা প্রায় ৩,৫০০ আলোকবর্ষ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে এই পরিমাপটি ধুলোর কোনো এলোমেলো ক্ষুদ্র স্তূপ নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বাহুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

অবশ্যই এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে: ছায়াপথের সমতলের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান উজ্জ্বল গামা-রশ্মি বিস্ফোরণ খুব কমই ঘটে। ২৫ বছরের পর্যবেক্ষণে মাত্র কয়েকটি উপযুক্ত ঘটনা ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এই সামান্য তথ্যও আমাদের নক্ষত্রখচিত ঘর সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

এর ভেতরে বাস করেও আমরা আকাশগঙ্গাকে নতুন করে আবিষ্কার করে চলেছি। প্রতিটি নতুন তথ্য—বাহুগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান থেকে শুরু করে ভরের বিন্যাস পর্যন্ত—আমাদের ছায়াপথ কীভাবে গঠিত হয়েছে এবং বিবর্তিত হচ্ছে তা আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। আর কে জানে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য আর কী কী চমক অপেক্ষা করছে।

1 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।