নবীন নক্ষত্রের চৌম্বকীয় জেটের জন্মরহস্য উন্মোচন করল ‘আলমা’

লেখক: Uliana S

HH 211 প্রোটোস্টার। এটি প্রায় 35 000 বছর বয়সী, এর ভর সূর্যের ভরের মাত্র 6%, এবং এটি আমাদের থেকে 1000 আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।

মহাকাশের গভীরে, আমাদের থেকে প্রায় এক হাজার আলোকবর্ষ দূরে, তৈরি হচ্ছে অন্যতম এক নবীন নক্ষত্র—প্রোটোস্টার ‘এইচএইচ ২১১’ (HH 211)। এর বয়স মাত্র ৩৫ হাজার বছরের মতো, আর ভর আমাদের সূর্যের ভরের তুলনায় মাত্র ৬ শতাংশ। এটি একটি খাঁটি মহাজাগতিক শিশু নক্ষত্র, আর চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত আলমা (ALMA) টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল একে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

নক্ষত্র জন্মের এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা জটিল কোনো নির্মাণকাজের মতো। একটি নবীন নক্ষত্রের চারপাশে ‘অ্যাক্রিশন ডিস্ক’ বা গ্যাস ও ধূলিকণার একটি ঘূর্ণায়মান মেঘ তৈরি হয়। এই ডিস্ক থেকে উপাদানগুলো ধীরে ধীরে নক্ষত্রের ওপর আছড়ে পড়ে তার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তবে এখানে একটি বিপত্তি ঘটে: ঘূর্ণায়মান উপাদানগুলোতে কৌণিক ভরবেগ এত বেশি থাকে যে, কোনো ‘রিলিজ ভালভ’ বা নির্গমন পথ ছাড়া সেগুলো কার্যকরভাবে নক্ষত্রের ওপর জমা হতে পারে না। এই নির্গমন পথ হিসেবে কাজ করে শক্তিশালী দ্বি-মুখী চৌম্বকীয় বিচ্ছুরণ বা ‘জেট’, যা নক্ষত্রের বিপরীত দিক থেকে অতিরিক্ত কৌণিক ভরবেগকে বাইরে বের করে দেয়।

এখন পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারেননি যে এই জেটগুলো ঠিক কোথা থেকে উৎপন্ন হয়। এগুলো প্রোটোস্টারের ঠিক নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে তৈরি হয়—যার দূরত্ব পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের তুলনায় কয়েক দশ গুণ কম। এই সূচনাস্থলটি ঘন ধূলিকণায় ঢাকা থাকায় জেমস ওয়েবের মতো অপটিক্যাল বা ইনফ্রারেড টেলিস্কোপগুলো তার ভেতর দিয়ে দেখতে পায় না। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বিশ্বের বৃহত্তম রেডিও টেলিস্কোপ নেটওয়ার্ক আলমা, যা মিলিমিটার এবং সাব-মিলিমিটার তরঙ্গে কাজ করে। এই তরঙ্গগুলো খুব সহজেই ধূলিকণার ঘন আবরণ ভেদ করে এগিয়ে যেতে সক্ষম।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, এইচএইচ ২১১ থেকে নির্গত জেটটি প্রতি সেকেন্ডে ১০০ কিলোমিটারের বেশি বেগে ছুটে চললেও এটি ঘোরে খুব ধীরগতিতে। কৌণিক ভরবেগ ও শক্তির পরিমাপ বিশ্লেষণ করে এএসআইএএ-র (ASIAA) গবেষক চিন-ফেই লির নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা এই জেটের সূচনাবিন্দুটি নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছেন: এটি অ্যাক্রিশন ডিস্কের একদম অভ্যন্তরীণ প্রান্তে, প্রোটোস্টার থেকে মাত্র ০.০২ জ্যোতির্বিদ্যা একক (AU) দূরে অবস্থিত। এই প্রাপ্ত ফলাফলটি তাত্ত্বিক ‘এক্স-উইন্ড’ (X-wind) মডেলের সাথে হুবহু মিলে যায়, যেখানে চৌম্বক ক্ষেত্র একটি বিশাল গুলতির মতো কাজ করে গ্যাসকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়।

এই প্রথমবার এত নিখুঁতভাবে কোনো প্রোটোস্টেলার চৌম্বকীয় জেটের জন্মস্থান ‘ধরা’ সম্ভব হলো। নক্ষত্রগুলো ঠিক কীভাবে তাদের অতিরিক্ত ঘূর্ণন গতি থেকে মুক্তি পায় এবং ক্রমাগত বড় হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি বিরাট মাইলফলক। যেহেতু গ্রহগুলোও একই ধরনের ডিস্কে গঠিত হয়, তাই এই নতুন তথ্যগুলো গ্রহমন্ডলী সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়গুলো বুঝতেও আমাদের সাহায্য করবে।

আলমার তোলা ছবিগুলো জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের পাওয়া তথ্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে: একত্রে তারা দেখাচ্ছে কীভাবে এই জেটগুলো চারপাশের বাধাগুলো ভেদ করে মহাকাশে উজ্জ্বল পথ তৈরি করছে। এইচএইচ ২১১-এর এই পর্যবেক্ষণ যেন এমন এক গবেষণাগারে উঁকি দেওয়া, যেখানে প্রকৃতি খোদ আমাদের চোখের সামনেই নতুন নক্ষত্র তৈরি করছে। প্রতিটি এ ধরনের গবেষণা আমাদের সেই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তরের আরও কাছে নিয়ে যায়: কীভাবে শীতল মহাজাগতিক মেঘ থেকে সূর্যের জন্ম হয় এবং সেখান থেকেই সম্ভবত আমাদের পৃথিবীর মতো নতুন জগতের সৃষ্টি হয়।

6 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।