প্রজেক্ট সেটি (Project CETI) এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রথমবারের মতো অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি তথ্য সামনে এসেছে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, স্পার্ম হোয়েল বা কাসালোট তিমির ডাকের মধ্যে এমন কিছু কাঠামোগত উপাদান রয়েছে যা মানুষের ভাষার স্বরবর্ণের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই গবেষণাটি সামুদ্রিক প্রাণীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে।
এই গবেষণার মূল ভিত্তি হলো ডোমিনিকা (Dominica) উপকূল থেকে সংগ্রহ করা হাজার হাজার শব্দের রেকর্ডিং। ডোমিনিকা হলো বিশ্বের সেই হাতেগোনা কয়েকটি স্থানের একটি, যেখানে কাসালোট তিমিরা একটি স্থিতিশীল মাতৃতান্ত্রিক সমাজ গঠন করে বসবাস করে। সেখানে তারা নিয়মিতভাবে একে অপরের সাথে অত্যন্ত জটিল শব্দ বিনিময়ের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলে।
গবেষণার ফলাফল থেকে এটি এখন স্পষ্ট যে, মহাসাগর কেবল শব্দে পূর্ণ কোনো স্থান নয়, বরং এটি একটি প্রাণবন্ত কথোপকথনের জগত। তিমিরা কেবল শব্দ করে না, তারা আসলে একে অপরের সাথে কথা বলে। এই আবিষ্কারটি সমুদ্রের গভীরের এক অজানা জগতকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, কাসালোট তিমির এই বিশেষ সংকেতগুলো, যেগুলোকে 'কোড' বলা হয়, মোটেও এলোমেলো নয়। এই কোডগুলো মূলত ক্লিকের একটি ছন্দময় ধারাবাহিকতা, যা একটি নির্দিষ্ট নিয়মে সাজানো থাকে। এই শৃঙ্খলার মাধ্যমেই তারা তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে।
এই কোডগুলোর গভীরে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দুটি প্রধান এবং স্থিতিশীল সংকেত বিভাগ খুঁজে পেয়েছেন। গবেষকরা এই শব্দগুলোকে 'এ-টাইপ' (a-type) এবং 'আই-টাইপ' (i-type) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এগুলো সরাসরি মানুষের স্বরবর্ণের মতো না হলেও এদের কার্যকারিতা অনেকটা একই রকম।
বিজ্ঞানীদের মতে, এগুলো আসলে 'ফোনোলজিক্যাল ক্যাটাগরি' বা ধ্বনিগত বিভাগ। মানুষের ভাষা যেভাবে বিভিন্ন ধ্বনির কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, তিমির এই যোগাযোগ ব্যবস্থাও ঠিক সেই একই স্তরের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি তাদের যোগাযোগের গভীরতাকে নির্দেশ করে।
এই গবেষণার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শব্দের স্থায়িত্ব। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, একটি ক্লিকের স্থায়িত্ব বা তার সময়কাল পরিবর্তনের সাথে সাথে শব্দের অর্থও বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ, কাসালোট তিমিরা শব্দের সময়গত স্থাপত্যকে তথ্য আদান-প্রদানের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।
এতদিন পর্যন্ত ধারণা করা হতো যে, ভাষার এমন জটিল এবং সুশৃঙ্খল সংগঠন কেবল মানুষের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। কিন্তু নতুন এই তথ্য আমাদের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এখন আমরা জানি যে, কাসালোট তিমির যোগাযোগ ব্যবস্থায় ছন্দ, সময়ের বৈচিত্র্য এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাঠামোর মতো উপাদানগুলো বিদ্যমান।
এটি কেবল সাধারণ কোনো সংকেত আদান-প্রদান নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ব্যবস্থাটি মানুষের ভাষা থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে। বিবর্তনীয় ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানুষ এবং কাসালোট তিমি প্রায় ৯০ মিলিয়ন বছর আগে একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল।
কুঁজো তিমি বা হাম্পব্যাক হোয়েলের গানের সাথে কাসালোট তিমির এই কোডের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। হাম্পব্যাক হোয়েলের গান অনেকটা সংগীতের মতো হলেও, কাসালোট তিমির এই কোডগুলো অনেকটা মানুষের কথোপকথনের মতো কাজ করে। এটি অনেকটা একজনের কথার পিঠে অন্যজনের উত্তর দেওয়ার মতো।
তাদের এই শব্দ বিনিময় মূলত দলের ভেতরে বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় সাধন এবং একে অপরের বার্তার প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এই কারণেই প্রজেক্ট সেটির গবেষকরা একে একটি 'অ-মানবীয় ভাষা ব্যবস্থা'র সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছেন, যা অত্যন্ত উন্নত।
এই বিশাল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণের জন্য বিজ্ঞানীরা আধুনিক মেশিন লার্নিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এআই-এর সাহায্যে তিমির ডাকের বর্ণালী কাঠামো, ক্লিকের স্থায়িত্ব এবং বিরতির বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট কিছু প্যাটার্ন খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছে।
ইতিহাসে এই প্রথমবার কাসালোট তিমির শব্দ ব্যবস্থাকে ধ্বনিবিজ্ঞানের স্তরে অর্থাৎ ভাষার কাঠামোর নিরিখে গবেষণা করা হয়েছে। এটি বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিশাল সাফল্য, কারণ এর আগে তিমির ডাককে এভাবে ভাষার কাঠামোর সাথে তুলনা করে দেখা হয়নি।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বর্তমানে অপরিসীম কারণ আমরা প্রথমবারের মতো অ-মানবীয় ভাষা অনুবাদের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছি। এটি কেবল কোনো রূপক নয়, বরং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত একটি সম্ভাবনা। মানব ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম আমরা বুঝতে পারব যে মহাসাগর নিজের সম্পর্কে আসলে কী বলতে চায়।
এই বৈজ্ঞানিক ঘটনাটি আমাদের গ্রহের সামগ্রিক চেতনায় নতুন কিছু সত্য যোগ করেছে:
- এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, ভাষা তৈরির ক্ষমতা কেবল মানুষের একচেটিয়া অধিকার নয়।
- গভীর সমুদ্রের অন্ধকার জগতেও একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং সামাজিক কাঠামো বিদ্যমান থাকতে পারে।
বিজ্ঞানের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম আমরা পৃথিবীতে অন্য একটি বুদ্ধিমান সামাজিক ব্যবস্থার অস্তিত্বের স্পষ্ট লক্ষণ শুনতে পাচ্ছি। দীর্ঘকাল ধরে মানুষ নিজেকে এই গ্রহের একমাত্র কণ্ঠস্বর মনে করে আসলেও, এখন এটি পরিষ্কার যে আমরা সবসময়ই অন্যান্য কথা বলা জগতের মাঝেই বসবাস করে আসছি। আমাদের চারপাশেই রয়েছে এমন এক জগত যা আমাদের মতোই সামাজিক এবং বুদ্ধিমান।


