বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও শি জিনপিং: বাণিজ্য আলোচনায় অগ্রগতির খবর

সম্পাদনা করেছেন: Aleksandr Lytviak

২০২৬ সালের ১৪ মে, বেইজিংয়ের গ্রেট হল অফ দ্য পিপল-এ বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির নেতাদের মধ্যে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি নতুন মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারগুলো এই খবরের প্রতি কিছুটা সতর্ক কিন্তু ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তবে দুই দেশের মধ্যে হওয়া এই চুক্তির মূল বিষয়গুলো এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।

এই আলোচনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফলাফল হলো শুল্ক সংক্রান্ত চাপের ক্ষেত্রে একটি নির্বাচিত শিথিলকরণ নীতি গ্রহণ করা। দুই পক্ষই জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সরাসরি যুক্ত নয় এমন পণ্যগুলোর ওপর থেকে শুল্ক কমানোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে সম্মত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে স্বস্তি ফেরাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বেইজিং এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে এই সমঝোতায় বিরল মৃত্তিকা ধাতু বা রেয়ার আর্থ মেটাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চীন মার্কিন হাই-টেক শিল্পের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই খনিজগুলোর সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনা ভোগ্যপণ্য আমদানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করার আশ্বাস দিয়েছে, যা দুই দেশের শিল্প খাতের জন্য লাভজনক হবে।

কৃষি খাতকে এই আলোচনার প্রাণভোমরা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিং থেকে এমন কিছু প্রতিশ্রুতি আদায় করেছেন যা তার দেশের কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মার্কিন সয়াবিন চাষীদের জন্য এটি একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য সহায়ক হতে পারে।

চুক্তির শর্তানুসারে, চীন ২০২৬ সালে অন্তত ২৫ মিলিয়ন টন মার্কিন সয়াবিন ক্রয়ের পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে, যা ২০২৮ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, মার্কিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ শুল্ক পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের বিষয়েও আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে। এটি জ্বালানি খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

শুধুমাত্র সয়াবিন বা গ্যাস নয়, এই চুক্তিতে মার্কিন গরুর মাংসের আমদানি বৃদ্ধি এবং বোয়িং কোম্পানির তৈরি বেসামরিক বিমানের ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো দুই দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষায় এবং মার্কিন উৎপাদন খাতে গতি ফেরাতে সহায়ক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এই বৈঠকের একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন হলো একটি স্থায়ী আন্তঃসরকারি বোর্ড অফ ট্রেড বা বাণিজ্য পরিষদ গঠন। এই সংস্থাটি কৃষি এবং সাধারণ ভোগ্যপণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উদ্ভূত যেকোনো বিরোধ সরাসরি নিরসনে কাজ করবে। এর মূল লক্ষ্য হলো ২০২৫ সালের মতো বিধ্বংসী শুল্ক যুদ্ধ এড়ানো, যা বিশ্ববাজারকে মারাত্মকভাবে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল।

তবে এত ইতিবাচক আলোচনার মাঝেও কিছু মৌলিক এবং সংবেদনশীল মতপার্থক্য এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তাইওয়ান ইস্যুতে শি জিনপিং অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এই বিষয়টিকে চীনের জন্য একটি রেড লাইন বা চরম সীমা হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ওয়াশিংটনকে ওই দ্বীপে আরও অস্ত্র সরবরাহ করার বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।

প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও কোনো বড় ধরনের সমঝোতা বা বরফ গলার লক্ষণ দেখা যায়নি। উন্নত চিপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আগের মতোই বহাল রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষেত্রগুলোকে এখনও জাতীয় নিরাপত্তার চশমায় দেখছে, যার ফলে এই খাতে কোনো বিশেষ ছাড় বা শিথিলতা প্রদর্শন করা হয়নি।

বর্তমানে দুই দেশের প্রতিনিধি দলগুলো চূড়ান্ত সমঝোতা স্মারকের খসড়া তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছেন। বৈঠক শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রেট হল অফ দ্য পিপল ত্যাগ করে টেম্পল অফ হেভেনের দিকে রওনা হন। সেখানে সাংবাদিকদের সাথে অনানুষ্ঠানিক আলাপকালে তিনি শি জিনপিংকে একজন মহান নেতা এবং চীনকে একটি চমৎকার দেশ হিসেবে অভিহিত করেন। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ওয়াশিংটনে বাণিজ্য মন্ত্রী পর্যায়ে পরবর্তী দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

15 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • China’s Xi hails trade progress in Trump summit, sends Taiwan warning

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।