২০২৬ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন (যা এককালে ভাইকিংদের একটি জেলিপল্লি ছিল) আবারও বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের বার্ষিক সূচকে—গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে (Global Liveability Index)—শীর্ষস্থান দখল করেছে, যা খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU) তৈরি করেছে। ডেনমার্কের এই রাজধানী শহরটি ভিয়েনা ও মেলবোর্নকে পেছনে ফেলে শিক্ষা, অবকাঠামো এবং স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্কোর অর্জন করেছে।
'পজিটিভ নিউজ' (Positive News) ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের চাহিদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জনবান্ধব পদ্ধতি গ্রহণের কারণেই কোপেনহেগেন এই সাফল্য অর্জন করেছে।
কীভাবে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে?
ইআইইউ (EIU) এর এবারের সূচকে বিশ্বজুড়ে ১৭৩টি শহরকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। পাঁচটি প্রধান বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি শহর কতটা বাসযোগ্য তা নির্ধারণ করা হয়েছে:
১. স্থিতিশীলতা (অপরাধের হার, সন্ত্রাসবাদের হুমকি এবং সামাজিক অস্থিরতা)।
২. স্বাস্থ্যসেবা (চিকিৎসার সুযোগ এবং মান)।
৩. সংস্কৃতি ও পরিবেশ (জলবায়ু, দূষণ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার-আচরণের সুযোগ)।
৪. শিক্ষা (স্কুলের সুযোগ ও মান)।
৫. অবকাঠামো (রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, আবাসন, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের মান)।
২০২৬ সালের বিশ্বের সবচেয়ে আরামদায়ক ১০টি শহর
তালিকার শীর্ষস্থানে ঐতিহ্যগতভাবেই ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং এশিয়ার শহরগুলো জায়গা করে নিয়েছে। এখানে সেরা দশটি শহরের তালিকা দেওয়া হলো:
১. কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক
২. ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া
৩. মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া
৪. সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
৫. জুরিখ, সুইজারল্যান্ড
৬. জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
৭. ওসাকা, জাপান
৮. অ্যাডিলেড, অস্ট্রেলিয়া
৯. ভ্যাঙ্কুভার, কানাডা
১০. টোকিও, জাপান
ইআইইউ-এর তথ্যমতে বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলো
১. দামেস্ক, সিরিয়া
২. ত্রিপোলি, লিবিয়া
৩. ঢাকা, বাংলাদেশ
৪. করাচি, পাকিস্তান
৫. আলজিয়ার্স, আলজেরিয়া
৬. লাগোস, নাইজেরিয়া
৭. পোর্ট মোরসবি, পাপুয়া নিউ গিনি
৮. কিিয়েভ, ইউক্রেন
৯. হারারে, জিম্বাবুয়ে
১০. তেহরান, ইরান
তালিকায় সবচেয়ে বেশি উন্নতি করা শহরগুলো
১. ফুঝু, চীন (৯৩তম স্থান)
২. লিসবন, পর্তুগাল (৫৪)
৩. উক্সি, চীন (১০৬)
৪. নানজিং, চীন (৯৮)
৫. ঝুহাই, চীন (১০৫)
৬. কিংদাও, চীন (১১৪)
৭. টোকিও, জাপান (১০)
৮. নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র (৬৬)
৯. শেনিয়াং, চীন (৮৪)
১০. ডালিয়ান, চীন (১০১)
বছরের প্রধান প্রবণতা: এশিয়ার উত্থান এবং স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব
ইআইইউ বিশ্লেষকরা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্রবণতা চিহ্নিত করেছেন যা ২০২৬ সালের এই সূচককে প্রভাবিত করেছে:
এশিয়ার অগ্রগতি ও পশ্চিম ইউরোপের স্থবিরতা
পশ্চিম ইউরোপ এখনও সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে বাসযোগ্য অঞ্চল হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে প্রতিবেদনের লেখকরা উল্লেখ করেছেন যে, এ বছর ইউরোপীয় শহরগুলোর গড় স্কোরে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
অন্যদিকে, এশিয়ার শহরগুলো দৃঢ় উন্নতির ছাপ রেখে চলেছে। দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এই প্রথম সেরা ২০টি শহরের তালিকায় ৯টি এশীয় শহর এবং মাত্র ৭টি ইউরোপীয় শহর জায়গা করে নিয়েছে।
চিকিৎসায় বিনিয়োগ চীনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে
এবারের সূচকে স্বাস্থ্যসেবা একটি প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই খাতে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি বিনিয়োগের ফলে চীনের শহরগুলো 'স্বাস্থ্যসেবা' বিভাগে উল্লেখযোগ্য স্কোর অর্জন করেছে। উন্নতির এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে শিল্পনগরী ফুঝু।
তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা চীনা মেগাসিটিগুলোর জন্য একটি 'সীমানা' নির্ধারণ করেছেন: রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতার কারণে 'সংস্কৃতি ও পরিবেশ' বিভাগে তাদের স্কোর এখনও কম, যা তাদের সামগ্রিক র্যাঙ্কিংয়ে আরও ওপরে উঠতে বাধা দিচ্ছে।
নিউ ইয়র্কের পুনর্জাগরণ
আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের অবস্থানের ব্যাপক উন্নতি। এই সূচকে অংশ নেওয়া ১৭৩টি শহরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করা শহরগুলোর একটি হলো এটি। অপরাধের হার হ্রাস এবং সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি কমে আসার ফলেই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক ধারা সত্ত্বেও, নিউ ইয়র্ক মার্কিন শহরগুলোর মধ্যে ডেট্রয়েট ও লেক্সিংটনের পেছনে থেকে তালিকার নিচের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানেই রয়ে গেছে।
উপসংহার
২০২৬ সালের এই সূচক স্পষ্ট করে দেয় যে, উন্নত মানের শহুরে জীবন আর কেবল পশ্চিমা রাজধানীগুলোর একচেটিয়া অধিকার নয়। কোপেনহেগেনের সাফল্য প্রমাণ করে যে, নগর পরিকল্পনায় বাসিন্দাদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিলে তা অসাধারণ ফলাফল বয়ে আনে। একই সময়ে স্বাস্থ্যসেবার দিকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব বৃদ্ধি এবং এশীয় মেগাসিটিগুলোর দ্রুত উত্থান নির্দেশ করে যে, 'আদর্শ শহর'-এর ধারণাটি প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে।




