একটি সমুদ্রের শঙ্খ, স্ট্র্যাডিভ্যারিয়াস ভায়োলিন, সূর্যমুখী ফুল এবং একটি অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোলের মধ্যে মিল কোথায়?
প্রথম নজরে মনে হতে পারে—এদের মধ্যে কোনো মিল নেই। এগুলো সম্পূর্ণ আলাদা জগতের বস্তু। কোনোটি জন্ম নেয় মহাসাগরে, কোনোটি মানুষের হাতে তৈরি হয়, আবার কোনোটি গড়ে ওঠে নক্ষক্ষত্রপুঞ্জের মাঝে।
কিন্তু একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে একটি বিস্ময়কর সামঞ্জস্য নজরে আসে।
মনে হয় প্রকৃতি যেন বারবার একই গল্প বলছে।
রূপ বা আকারের গল্প। কম্পনের গল্প। অনুরণনের গল্প।
শঙ্খের ভেতর যেখানে মহাসাগর বাস করে
ছোটবেলায় আমাদের মধ্যে অনেকেই কানের কাছে শঙ্খ ধরে সমুদ্রের গর্জন শোনার চেষ্টা করেছি।
মনে হতো যেন সমুদ্রটি ওর সর্পিল খাঁজের ভেতরে লুকিয়ে আছে। আসলে এর ভেতরে কোনো ঢেউ বা জোয়ার নেই।
আমরা আসলে চারপাশের শব্দগুলোকেই শুনি, যা শঙ্খের জ্যামিতিক গঠনের কারণে উচ্চকিত ও রূপান্তরিত হয়।
এখানে আকার নিজেই একটি বাদ্যযন্ত্র হয়ে ওঠে।
এটি মহাকাশের বা আশেপাশের কম্পনগুলোকে সংগ্রহ করে শব্দে পরিণত করে।
কখনও কখনও সুর সৃষ্টির জন্য কেবল একটি সুসংগঠিত কাঠামোই যথেষ্ট।
কাঠামোর রহস্য
কয়েক শতাব্দী ধরে কারিগর ও বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন কেন আন্তোনিও স্ট্র্যাডিভ্যারিয়াসের তৈরি ভায়োলিনগুলোর সুর এত অনন্য। অবশ্যই এর ব্যবহৃত উপকরণের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
তবে ক্রমবর্ধমান গবেষণায় বাদ্যযন্ত্রটির জ্যামিতিক কাঠামোর গুরুত্বই বেশি ফুটে উঠছে।
কাঠামোর প্রতিটি বাঁক। ভেতরের প্রতিটি শূন্যস্থান। প্রতিটি রেখা ও অনুপাত।
এখানে আকারের কারণেই শব্দের জন্ম হয়।
কাঠ নিজে থেকেই কণ্ঠে পরিণত হয় না, বরং তার স্থাপত্যশৈলী তাকে অনুরণিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
যেখানে কাঠামোর সাথে গতির মিলন ঘটে, সেখানেই সংগীতের উদ্ভব হয়।
মস্তিষ্ক যখন আকার শোনে
'বুবা-কিকি ইফেক্ট' নামে পরিচিত একটি চমৎকার পরীক্ষা রয়েছে।
মানুষকে দুটি ছবি দেখানো হয়। একটি মসৃণ ও গোলাকার। অন্যটি তীক্ষ্ণ ও কোণাকার।
এরপর তাদের বলতে বলা হয় কোনটির নাম "বুবা" আর কোনটির নাম "কিকি"।
সারা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই একইভাবে উত্তর দেয়।
নরম আকৃতিটি হয় "বুবা"। আর তীক্ষ্ণটি হয় "কিকি"। আমাদের মস্তিষ্ক যেন আগে থেকেই জানে শব্দের রূপ কেমন। মনে হয় আকার ও শব্দের মধ্যে এমন এক অদৃশ্য বন্ধন রয়েছে, যা আমরা যৌক্তিক বিশ্লেষণের আগেই অনুভব করতে পারি।
বিকাশের সুর
একটি সূর্যমুখীর দিকে তাকান। একটি পাইন ফলের দিকে। একটি ফার্ন গাছের দিকে। একটি সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে।
ঘূর্ণিঝড়ের কুন্ডলী। ছায়াপথের বাহু। প্রকৃতি অনবরত একই ধরণের নকশা ব্যবহার করে চলেছে।
সর্পিল আকার। ফ্র্যাক্টাল। ঢেউ। ছন্দ। বিজ্ঞানীরা গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াগুলো ব্যাখ্যা করেন।
কিন্তু জটিল সব সূত্রের পেছনে লুকিয়ে আছে একটি সহজ সত্য: রূপ বা আকার গতির স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। যেন বৃদ্ধি বা বিকাশ নিজের চিহ্ন রেখে যায়। যেন শক্তি পদার্থের বুকে নিজের স্বাক্ষর এঁকে দেয়।
ব্ল্যাক হোলের কণ্ঠস্বর
এই গল্পের সবচেয়ে অভাবনীয় মোড়টি রয়েছে পৃথিবীর সীমানার অনেক বাইরে।
পার্সিয়াস গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের কেন্দ্রে একটি অতিবৃহৎ ব্ল্যাক হোল অবস্থিত।
একে ঘিরে থাকা উত্তপ্ত গ্যাস পর্যবেক্ষণ করে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানীরা বিশাল চাপের তরঙ্গ খুঁজে পেয়েছেন।
মূলত—এটি কম্পন। ছন্দ। মহাকাশের স্পন্দন।
এই তরঙ্গগুলোর কম্পাঙ্ক এতই কম যে একে পরিচিত মহাবিশ্বের সবচেয়ে খাদের সুর বা 'লোয়েস্ট নোট' বলা হয়।
এটি মধ্যম 'সি' (C) নোটের চেয়ে প্রায় ৫৭ অকটেভ নিচে অবস্থিত।
মানুষের শ্রবণেন্দ্রিয় সরাসরি এটি কখনোই শুনতে পাবে না। তবে 'সোনিফিকেশন' বা বৈজ্ঞানিক তথ্যকে শ্রবণযোগ্য শব্দে রূপান্তরের মাধ্যমে নাসা (NASA) মানুষকে এই মহাজাগতিক কাঠামোর আওয়াজ শোনার সুযোগ করে দিয়েছে।
এটি মানুষের লেখা কোনো সংগীত নয়। বরং মহাবিশ্বের অন্তরাত্মা থেকে বেরিয়ে আসা সুর।
সীমানা কোথায়?
যখন শঙ্খ চারপাশের পরিবেশকে শব্দে রূপান্তরিত করে। যখন ভায়োলিনের গঠন সুর সৃষ্টি করে।
যখন আকার দেখে মস্তিষ্ক শব্দের প্রকৃতি চিনে নেয়। যখন সূর্যমুখী ও গ্যালাক্সি একই জ্যামিতিক নীতি অনুসরণ করে। এমনকি যখন ব্ল্যাক হোলও ছন্দ ও কম্পনের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করে।
তখন একটি প্রশ্ন জাগে।
আকার আর সুরের মধ্যে সীমানাটা ঠিক কোথায়? সম্ভবত, এর কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
হতে পারে, আকার হলো দৃশ্যমান সংগীত। আর সংগীত হলো গতিশীল আকার।
এই আবিষ্কার পৃথিবীর সুরে নতুন কী যোগ করেছে?
এটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে পৃথিবী আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সংযুক্ত।
প্রকৃতি একই সাথে দুটি ভাষায় কথা বলে—আকারের ভাষা এবং কম্পনের ভাষা।
আর সম্ভবত, এ দুটি আসলে একই ভাষা।
সমুদ্রতীরের শঙ্খ থেকে শুরু করে গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলের ব্ল্যাক হোল পর্যন্ত, মহাবিশ্ব অবিরত বিচিত্র সব কাঠামো, ছন্দ আর অনুরণন তৈরি করে চলেছে।
প্রতিটি সর্পিল আকৃতি গতির এক একটি গল্প হয়ে ওঠে। প্রতিটি ঢেউ রেখে যায় নিজের স্বাক্ষর।
প্রতিটি আকারই তার সৃষ্টির প্রক্রিয়ার স্মৃতি বহন করে।
আর সম্ভবত, সমগ্র সৃষ্টি এই নিরন্তর কথোপকথনের মাধ্যমেই বিকশিত হচ্ছে।
এমন এক সংলাপ, যেখানে সংগীত আকারে রূপ নেয়।
আর আকার হয়ে ওঠে সংগীত।
যেখানে প্রতিটি নতুন কাঠামো জীবনের মহান ঐকতান বা 'গ্রেট সিম্ফনি'-র এক একটি সুর হয়ে ধরা দেয়।



