পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের জীবন ও কর্মের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র 'মাইকেল' বিশ্বজুড়ে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ২০২৬ সালের বসন্তে মুক্তি পাওয়া এই বায়োপিকটি বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচিত এবং ব্যবসাসফল মিউজিক্যাল ড্রামায় পরিণত হয়েছে। এটি কেবল একজন শিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়, বরং দর্শকদের মাঝে নস্টালজিয়া এবং পেশাদার মহলে গভীর আলোচনার এক নতুন জোয়ার তৈরি করেছে।
এই সিনেমার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক কালজয়ী প্রতিভার অভ্যন্তরীণ জগতের গভীর বিশ্লেষণ। প্রাপ্তবয়স্ক মাইকেল জ্যাকসনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তার আপন ভাতিজা জাফর জ্যাকসন, যিনি মাইকেলের বড় ভাই জার্মেইন জ্যাকসনের ছেলে। দর্শকদের মতে, জাফরের শারীরিক ভঙ্গি, মঞ্চের উপস্থিতি এবং কণ্ঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ এতটাই নিখুঁত ছিল যে মনে হচ্ছিল স্বয়ং মাইকেলই পর্দায় ফিরে এসেছেন। বংশগত এই সংযোগটি তার প্রতিটি নাচের মুদ্রা এবং কণ্ঠের জাদুতে এক অদ্ভুত সত্যতা ফুটিয়ে তুলেছে।
জ্যাকসন ফাইভ ব্যান্ডের সেই সোনালী দিনগুলোতে কিশোর মাইকেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন উদীয়মান তরুণ অভিনেতা জুলিয়ানো ক্রু ভালদি। গ্যারি, ইন্ডিয়ানা থেকে উঠে আসা একটি সাধারণ ছেলে কীভাবে ধাপে ধাপে বিশ্বসেরা আইকনে পরিণত হলো, তা জুলিয়ানোর অভিনয়ে অত্যন্ত আবেগঘন ও সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে। তার অভিনয় সিনেমাটিতে এক ধরনের সততা এবং আন্তরিকতা যোগ করেছে যা দর্শকদের সরাসরি সেই সময়ের সাথে যুক্ত করে।
সিনেমার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রেও তারকার মেলা বসেছে। মাইকেলের বাবা জো জ্যাকসনের জটিল ও কঠোর চরিত্রে অভিনয় করেছেন অস্কার মনোনীত অভিনেতা কোলম্যান ডমিঙ্গো। পরিবারের প্রধান হিসেবে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কঠোরতা এবং আড়ালে থাকা মানবিক দিকগুলো তিনি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়াও নিয়া লং মাইকেলের মা ক্যাথরিন জ্যাকসন হিসেবে এবং মাইলস টেলার আইনজীবী জন ব্রাঙ্কার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাদের প্রত্যেকের অভিনয় শিল্পীর পারিবারিক ও ব্যবসায়িক জীবনের টানাপোড়েনগুলো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে।
বিখ্যাত পরিচালক অ্যান্টোইন ফুকুয়া, যিনি 'দ্য ইকুয়ালাইজার' সিনেমার জন্য পরিচিত, এই মিউজিক্যাল ড্রামাটি পরিচালনা করেছেন। অপরাধ জগতের গল্প ছেড়ে তিনি এবার বেছে নিয়েছেন সুরের জগতকে, যেখানে তিনি ভিজ্যুয়াল পোয়েট্রি এবং ছন্দময় সম্পাদনার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। কাহিনীর বিস্তার জ্যাকসন ফাইভের শুরু থেকে শুরু করে আশির দশকের শেষভাগের সেই কিংবদন্তি একক ক্যারিয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে।
চলচ্চিত্রটি সচেতনভাবেই শিল্পীর ব্যক্তিগত বিতর্ক বা কেলেঙ্কারির চেয়ে তার সৃজনশীলতার ওপর বেশি আলোকপাত করেছে। কিছু সমালোচক একে অতিরিক্ত পরিচ্ছন্ন বা আদর্শবাদী চিত্রায়ন বলে সমালোচনা করলেও, এতে মাইকেলের ব্যক্তিগত জীবনের গভীর দর্শন, বাবার সাথে সম্পর্ক এবং তার শারীরিক পরিবর্তনের পর্যায়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখানো হয়েছে। নির্মাতারা সস্তা গসিপের বদলে শিল্পীর কষ্ট, কঠোর শৃঙ্খলা এবং শিল্পের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাসকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
সিনেমার বিশাল আয়োজন এবং নির্মাণের স্কেল দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। জ্যাকসন ফাইভ থেকে শুরু করে বিশ্বভ্রমণ পর্যন্ত বিভিন্ন যুগকে নিখুঁতভাবে পুনর্নির্মাণ করতে হাজার হাজার পোশাক এবং বিশাল সেট ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৮৮ সালে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামের সেই ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সটি যেভাবে পর্দায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে, তা এক কথায় অতুলনীয় এবং প্রামাণ্যচিত্রের মতো নিখুঁত যা দর্শকদের সেই সময়ের উন্মাদনার কথা মনে করিয়ে দেয়।
সিনেমার একটি সংলাপ দর্শকদের মনে বিশেষভাবে গেঁথে গেছে, যেখানে মাইকেলকে বলতে শোনা যায় যে তিনি স্রষ্টার কাছ থেকে নতুন সুরের অপেক্ষায় আছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে যদি তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন, তবে স্রষ্টা সেই সুর অন্য কাউকে, যেমন প্রিন্সকে দিয়ে দেবেন। এই দৃশ্যটি মাইকেলের আধ্যাত্মিকতা, শিশুসুলভ সরলতা এবং সুরের প্রতি তার আজীবন নিবেদনকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।
বক্স অফিসে এই বায়োপিকটি সমস্ত পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে। মুক্তির পরপরই এটি শত কোটি ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করার পথে রয়েছে এবং এই ঘরানার সবচেয়ে সফল সিনেমা হওয়ার দাবি রাখছে। লায়ন্সগেট স্টুডিও ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে তারা এই সিনেমার একটি সিক্যুয়েল বা পরবর্তী অংশ নির্মাণ করবে, যেখানে নব্বই এবং দুই হাজার দশকের পরবর্তী ঘটনাবলী এবং শিল্পীর জীবনের শেষ অধ্যায়গুলো তুলে ধরা হবে।
'মাইকেল' (২০২৬) সিনেমাটি পপ সম্রাটের ভক্তদের জন্য এক অনন্য উপহার যা তাদের নতুন করে তার প্রেমে পড়তে বাধ্য করবে। এটি কেবল কতগুলো হিট গানের সংকলন নয়, বরং একজন প্রতিভাধর শিল্পীর অভ্যন্তরীণ জগতকে বোঝার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা। নতুন দশকের অন্যতম সেরা মিউজিক্যাল বায়োপিক হিসেবে এটি দীর্ঘকাল সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
গায়া ওয়ান এই চলচ্চিত্রটিকে ১০ এর মধ্যে ৮ রেটিং দিয়েছে। বিশেষ করে সেই আবহ সংগীতের জন্য যা দৃশ্যগুলোর মাঝে নীরবতাকেও অর্থবহ করে তোলে এবং সেই নাচের দৃশ্যগুলোর জন্য যা বড় পর্দায় দেখার মতো এক অনন্য অভিজ্ঞতা। যারা ভালো সিনেমা এবং সংগীত পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি অবশ্যই দেখার মতো একটি চলচ্চিত্র।



