২০২৬ সালের ১৬ জুলাই সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে এক বিশেষ ভাষণ দেন। এই ভাষণের পরপরই হোয়াইট হাউস প্রশাসন ইতিপূর্বে অত্যন্ত গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত বেশ কিছু নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করে। এই নথিপত্রগুলো মার্কিন নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিদেশি হস্তক্ষেপের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে প্রধানত চীনের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো মার্কিন গণতন্ত্রের সুরক্ষা ব্যবস্থার গভীর ও পদ্ধতিগত দুর্বলতাগুলোকে বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করেছে।
JUST IN - Trump releases documents reportedly exposing election interference in U.S.. whitehouse.gov/election-integ…
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের নির্বাচনী চক্র থেকে শুরু করে চীন মার্কিন ভোটারদের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ইতিহাসের বৃহত্তম গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা করেছে। এই অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ২২০ মিলিয়ন বা ২২ কোটি মার্কিন নাগরিকের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের মতো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীন কেবল এই বিপুল তথ্য সংগ্রহই করেনি, বরং তা বিশ্লেষণের জন্য একটি বিশেষায়িত ইউনিটও গঠন করেছিল। নথিতে আরও দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ২০২০ সাল থেকেই এই বিষয়ে তথ্য পেতে শুরু করেছিল, কিন্তু কিছু কর্মকর্তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই হুমকির গুরুত্বকে খাটো করে দেখেছিলেন এবং প্রেসিডেন্ট ও জনগণকে অন্ধকারে রেখেছিলেন।
Told you. China has been behind the divide in this country.
এই নথিপত্রগুলোতে বারবার 'ডিপ স্টেট' বা 'গভীর রাষ্ট্র' নামক একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি মূলত উচ্চপদস্থ আমলা এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক, যারা নথির দাবি অনুযায়ী সরাসরি কোনো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছিল। অভিযোগ উঠেছে যে, এই গোষ্ঠীটি চীনের হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত অস্বস্তিকর তথ্যগুলো ধামাচাপা দিয়েছিল যাতে নির্বাচনের প্রতি জনআস্থা বজায় থাকে এবং বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন না আসে। এই বিষয়টি বর্তমানে মার্কিন আমলাতন্ত্রের স্বাধীনতা এবং নির্বাচিত নেতাদের এড়িয়ে নীতি নির্ধারণে তাদের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
The NSA knew that China was attempting to prevent President Trump from being re-elected in 2020 and knowingly suppressed it from his briefings.
হোয়াইট হাউস একই সাথে ইলেকট্রনিক ভোটিং সিস্টেম এবং ব্যালট গণনা পদ্ধতির প্রযুক্তিগত দুর্বলতা সংক্রান্ত বিশদ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘকাল ধরেই জানত যে, এই পদ্ধতিগুলো চীনের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিপক্ষের সাইবার আক্রমণের শিকার হতে পারে। বিশেষ করে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের তদন্তে ভোটার নিবন্ধনে বড় ধরনের অনিয়ম এবং ভোটার তালিকায় কয়েক লক্ষ অ-নাগরিকের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। হোয়াইট হাউস এই নথিপত্রগুলো একটি বিশেষ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আপলোড করেছে এবং ভোটারদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিতকরণ ও ডেটা সুরক্ষার জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে। কংগ্রেসওম্যান অ্যানা পলিনা লুনা এবং অন্যান্য রিপাবলিকান নেতারা এই প্রকাশনাকে তাদের দীর্ঘদিনের আশঙ্কার একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
বর্তমানে এফবিআই কর্তৃক বিভিন্ন নির্বাচনী কার্যালয়ে তল্লাশি এবং নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাগুলো ঘটছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে 'চমকপ্রদ দুর্বলতা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা তার মতে বছরের পর বছর ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা বা গোপন করা হয়েছে। তবে সমালোচকরা এবং কিছু গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, পূর্ববর্তী মূল্যায়নগুলোতে ২০২০ সালের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে চীনের সরাসরি প্রভাবের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যদিও ভোটারদের তথ্যের প্রতি তাদের গভীর আগ্রহের বিষয়টি অনস্বীকার্য ছিল।
চীনের পক্ষ থেকে এই নথিপত্র প্রকাশের তীব্র ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এই অভিযোগগুলোকে 'সম্পূর্ণ বানোয়াট' এবং 'বিদ্বেষপূর্ণ অপবাদ' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, এই ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং এগুলো অনেক আগেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেছে যে, বেইজিং কখনোই আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেনি এবং করার কোনো অভিপ্রায়ও তাদের নেই। চীনের মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনাটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, যেখানে অনেকে বিষয়টিকে উপহাস করেছেন এবং কেউ কেউ নিজেদের সাইবার নিরাপত্তা আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন।
এই নথিপত্র প্রকাশের ঘটনাটি মার্কিন নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার ক্ষেত্রে একটি নতুন মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে যে, একটি আধুনিক গণতন্ত্রের ডিজিটাল অবকাঠামো কতটা বাহ্যিক হুমকি এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের মুখে নাজুক হতে পারে। যদিও এই প্রকাশের ফলে ভবিষ্যতে কী ধরনের আইনি সংস্কার বা তদন্ত হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, তবে নির্বাচনী ব্যবস্থার সুরক্ষা যে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়ে পরিণত হয়েছে তা স্পষ্ট। মার্কিন নাগরিকদের এখন এই তথ্যগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে এবং আগামী দিনের নির্বাচনী প্রচারণায় ঝুঁকি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
