গভীরের ছন্দ: তিমির নতুন উপভাষার জন্ম পর্যবেক্ষণ করছেন বিজ্ঞানীরা

লেখক: Inna Horoshkina One

ক্যাপশন: Whale Vowels Project CETI

২০২৬ সালের ২৪ জুন এক আন্তর্জাতিক গবেষক দল তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছে, যা তিমির যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়।

এই গবেষণার নেপথ্যে রয়েছেন সেই সব বিজ্ঞানীরা, যারা বহু বছর ধরে স্পার্ম হোয়েল বা কাসালোত তিমির যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে নিবিড় কাজ করছেন।

ইউনিভার্সিটি অফ সেন্ট অ্যান্ড্রুজ-এর ডক্টর Luke Rendell এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। গবেষণায় Taylor Hersh সহ জৈব-অ্যাকোস্টিক এবং তিমির আচরণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞগণ এবং ভূমধ্যসাগরীয় স্পার্ম হোয়েল পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির আন্তর্জাতিক সহকর্মীরাও যুক্ত ছিলেন। গবেষণাপত্রটি প্রসিডিংস অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি (Proceedings of the Royal Society B) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রাণীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে বর্তমান সময়ের অন্যতম উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ 'প্রজেক্ট সেটি' (Project CETI)-এর কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ও গবেষক David Gruber এই প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা জীববিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করেছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো স্পার্ম হোয়েলের যোগাযোগের কাঠামোটি বোঝা এবং তাদের মাঝে মানুষের ভাষার মতো কোনো জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে কি না তা যাচাই করা। এই কাজে তারা স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার রোবট, হাইড্রোফোন এবং উন্নত এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করছেন।

ভূমধ্যসাগরীয় উপভাষা সম্পর্কিত নতুন এই তথ্যগুলো 'প্রজেক্ট সেটি'-কে কাসালোতদের সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রে আরও একটি বড় সূত্র দিয়েছে। যদি তিমির বিভিন্ন দল তাদের নিজস্ব শব্দতরঙ্গীয় ঐতিহ্য ব্যবহার করে থাকে, তবে এর অর্থ হলো গবেষকদের কেবল একটি সার্বজনীন ভাষা নয়, বরং হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা অসংখ্য স্থানীয় 'উপভাষা' নিয়ে কাজ করতে হবে।

ভূমধ্যসাগরের বিরল এবং বিপন্ন প্রজাতির স্পার্ম হোয়েলদের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, এই অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন অংশে বসবাসকারী প্রাণীরা আলাদা আলাদা শব্দশৈলী বা 'উপভাষা' ব্যবহার করে—যা 'কোডাস' (codas) নামে পরিচিত বিশেষ ছন্দময় ক্লিক শব্দের সমষ্টি।

হাম্পব্যাক তিমির মতো স্পার্ম হোয়েলরা সুরেলা গান গায় না।

তাদের যোগাযোগ মূলত শক্তিশালী ক্লিক শব্দের ওপর নির্ভরশীল, যা পানির নিচ দিয়ে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। এই শব্দের ক্রমগুলো কেবল তথ্য আদান-প্রদানই করে না, বরং এটি নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবেও কাজ করে।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের স্পার্ম হোয়েলরা মূলত '৩+১' ছন্দে কথা বলে—যেখানে তিনটি নিয়মিত ক্লিকের পর একটু বিরতি দিয়ে চতুর্থ ক্লিকটি করা হয়। অন্যদিকে পূর্ব অংশের তিমীরা একই ধরনের কাঠামো ব্যবহার করলেও তাদের বলার গতি অনেক বেশি দ্রুত।

প্রথম দৃষ্টিতে এই পার্থক্যগুলোকে অতি সামান্য বলে মনে হতে পারে।

তবে তিমিদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন যে, কাসালোতরা সাধারণত সেই সব দলের সঙ্গেই মেলামেশা ও সহযোগিতা করতে চায় যাদের উপভাষা তাদের নিজেদের মতো। অর্থাৎ, এই উপভাষা সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে এবং সম্প্রদায়ের কাঠামো বজায় রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, গবেষকরা সম্ভবত বাস্তব সময়ে একটি সাংস্কৃতিক বিবর্তনের প্রক্রিয়া দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

তাদের ধারণা মতে, বর্তমান ভূমধ্যসাগরীয় কাসালোতদের পূর্বপুরুষরা প্রথমে পশ্চিম অংশে বসবাস শুরু করে এবং পরে তারা পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে নতুন দলটি ধীরে ধীরে তাদের শব্দশৈলীতে পরিবর্তন নিয়ে আসে, যদিও তারা তাদের আদি যোগাযোগের ধরনটিও ভুলে যায়নি।

আসলে বিজ্ঞানীরা এখানে একটি নতুন উপভাষার জন্মের সাক্ষী হয়ে আছেন।

প্রাণীজগতে কীভাবে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিকশিত ও পরিবর্তিত হয়, তা দেখার জন্য জীববিজ্ঞানীদের কাছে এটি এক অনন্য সুযোগ।

এই আবিষ্কারটি 'প্রজেক্ট সেটি'-র বর্তমান প্রচেষ্টার সাথেও মিলে যায়, যেখানে কাসালোতদের জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থার প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে।

গবেষকরা যত বেশি তথ্য পাচ্ছেন, ততই পরিষ্কার হচ্ছে যে কয়েক দশক আগের ধারণার তুলনায় কাসালোতদের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত।

এটি কেবল কতগুলো শব্দের সমাহার নয়।

এটি এমন একটি সুসংগত ব্যবস্থা যা এই প্রাণীদের একে অপরকে চিনতে, সমাজ গড়তে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

এই ঘটনাটি পৃথিবীর সামগ্রিক ধ্বনিমাধুর্যে নতুন কী মাত্রা যোগ করল?

হাজার বছর ধরে মানুষ ভাষাকে কেবল তার নিজের অনন্য সম্পদ বলে দাবি করে এসেছে।

কিন্তু সমুদ্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্য তুলে ধরছে।

কাসালোতরা দেখাচ্ছে যে সংস্কৃতি কেবল মানুষের একচেটিয়া কোনো বিষয় নয়। এটি বংশপরম্পরায় চলে আসা ছন্দে, যোগাযোগের ধরনে এবং একটি সম্প্রদায়ের যৌথ স্মৃতির মাঝেও টিকে থাকে।

সম্ভবত জীবনের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলো আমরা কথা বলতে শেখার সাথে শুরু হয় না।

বরং সেগুলো তখনই শুরু হয় যখন আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে শিখি।

ভূমধ্যসাগরের অতল গহ্বরে কয়েক হাজার বছর ধরে এক প্রাচীন কথোপকথন চলে আসছে।

আর মানুষ কেবল এখন সেই সুরের মূর্ছনা আর তার ভাবার্থ বুঝতে শুরু করেছে।

12 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Guardian — Different sperm whale ‘dialects’ detected on separate sides of the Mediterranean

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।