উদ্ভিদের জিনোম কেবল প্রাচীন সংক্রমণের ইতিহাসই নয়, বরং বিবর্তনের এক প্রকৃত আণবিক সংগ্রহশালা হিসেবে কাজ করে। ইনরা (INRAE) এবং সিরাড (CIRAD)-এর বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল ৯৩ প্রজাতির উদ্ভিদের ডিএনএ-তে 'কলিমোভিরিডি' (Caulimoviridae) পরিবারের এন্ডোজেনাস ভাইরাসের ৪৭ হাজারেরও বেশি খণ্ডাংশ খুঁজে পেয়েছেন। এই "আণবিক স্তরের জীবাশ্মগুলো" ইতিহাসের এমন এক অভূতপূর্ব বাতায়ন খুলে দিয়েছে, যা প্রায় ৩০ কোটি বছর আগের সেই সময়কে তুলে ধরে যখন পৃথিবীতে প্রথম সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদ এবং প্রাচীন বনাঞ্চল গড়ে উঠছিল।
কলিমোভিরিডি পরিবারের ভাইরাসগুলো হলো একমাত্র পরিচিত দ্বিসূত্রক ডিএনএ বিশিষ্ট উদ্ভিদ ভাইরাস, যাদের ডিএনএ মেরামতের সময় অ-স্থানীয় রিকম্বিনেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পোষক কোষের ক্রোমোজোমে নিজেদের জেনেটিক সিকোয়েন্স যুক্ত করার বিরল ক্ষমতা রয়েছে। এই এন্ডোজেনাস ভাইরাল এলিমেন্ট (EVE) বা "ভাইরাল জীবাশ্মগুলো" বংশপরম্পরায় স্থানান্তরিত হয় এবং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সংরক্ষিত থাকে, যা উদ্ভিদের জিনোমকে ভাইরাসের সাথে মিথস্ক্রিয়ার ইতিহাস লিপিবদ্ধকারী এক অনন্য ডায়েরিতে পরিণত করে। গবেষকরা মস এবং লাইকোপড থেকে শুরু করে ফার্ন, কনিফার এবং সপুষ্পক উদ্ভিদ পর্যন্ত ৯৩টি প্রজাতির উদ্ভিদ বিশ্লেষণ করেছেন এবং ভাইরাসের ৩৫টি আগে অজানা বিবর্তনীয় শাখা শনাক্ত করেছেন, যার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু কনিফার কাষ্ঠল উদ্ভিদে পাওয়া একটি নতুন গুচ্ছও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভাইরাসের বিবর্তনীয় ধারা এবং তাদের পোষক উদ্ভিদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এক জটিল সহাবস্থানের চিত্র উন্মোচন করেছে। অনেক ভাইরাস ধারা প্রকৃতপক্ষে কোটি কোটি বছর ধরে সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদের সাথে বিদ্যমান ছিল, তবে তাদের ইতিহাস মোটেও সরল ছিল না। ভাইরাসগুলো এক পোষক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে সংক্রমিত হয়েছে এবং পুরো ভাইরাস বংশধারা এক সময় বিলুপ্ত হয়ে আবার নতুন করে আবির্ভূত হয়েছে। ভাইরাস ধারার এইরকম বেশ কিছু বিলুপ্তি বৈশ্বিক পর্যায়ের মহাবিপর্যয়ের সাথে মিলে যায়—যেমন ২৫ কোটি ২০ লক্ষ বছর আগের পার্মিয়ান বিলুপ্তি, যখন ৯০ শতাংশেরও বেশি সামুদ্রিক প্রজাতি হারিয়ে গিয়েছিল এবং ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগের ক্রিটেসিয়াস-প্যালিওজিন বিলুপ্তি, যার ফলে ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়েছিল। এই সময়ে পরিবেশগত অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল, যা বাস্তুসংস্থানকে পুনর্গঠিত করে নতুন পরিবেশগত ক্ষেত্র বা 'ইকোলজিক্যাল নিশ' তৈরি করেছিল।
এই আবিষ্কারগুলো প্রমাণ করে যে পৃথিবীর জীবন এবং বিবর্তনের কাঠামোর সাথে ভাইরাস কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। উদ্ভিদের জিনোম কেবল বংশগতির তথ্যের আধার নয়, বরং অদৃশ্য সঙ্গীদের সাথে লক্ষ লক্ষ বছরের সম্পর্কের এক অকৃত্রিম মহাফেজখানা। ঠিক যেমন গাছের বর্ষবলয় অতীত যুগের খরা এবং দাবদাহের কথা জানান দেয়, তেমনি ডিএনএ-তে থাকা ভাইরাসের সিকোয়েন্সগুলো সেই সময়ের স্মৃতি বহন করে যখন বাস্তুসংস্থান বৈশ্বিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল এবং তার বিপরীতে নিজেকে পুনর্গঠিত করেছিল।
এই গবেষণা বিবর্তনে ভাইরাসের ভূমিকা নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে: তারা কেবল রোগই সৃষ্টি করে না, বরং চরম পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে উদ্ভিদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরিতেও অংশ নিয়েছে বলে মনে হয়। এমনকি সুদূর অতীতের যে সংক্রমণগুলো ক্ষতি করেছিল, সেগুলোও উদ্ভিদের জিনে এমন ছাপ রেখে গেছে যা বর্তমানে বৈশ্বিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় জীবদেহের কৌশল বুঝতে সাহায্য করছে।
২০২৬ সালের জুন মাসে 'পিএলওএস প্যাথোজেনস' (PLoS Pathogens) সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাটি প্যালিয়োভাইরোলজিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেখানে উদ্ভিদের জিনোমকে ভাইরাসের বিবর্তনের প্রাকৃতিক সংগ্রহশালা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন যে কীভাবে প্রাচীন ভাইরাসগুলো গণবিলুপ্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নতুন উদ্ভিদ গোষ্ঠীর উত্থানের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। বর্তমানের উদ্ভিদ এবং ভাইরাসজনিত রোগজীবাণুর মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া বোঝার জন্য এই জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি ভবিষ্যতে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের প্রতি উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে তা পূর্বাভাস দিতেও সাহায্য করতে পারে।
উদ্ভিদের জিনোম হলো ভাইরাসের সাথে লক্ষ লক্ষ বছরের সহাবস্থানের এক জীবন্ত ইতিবৃত্ত। আমরা এটি যত মনোযোগ দিয়ে পড়ব, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের বিপদ থেকে সবুজ পৃথিবীকে রক্ষা করার উপায় ততই ভালভাবে বুঝতে পারব।

