এমন একটি জায়গার কথা কল্পনা করুন যেখানে গতকাল পর্যন্ত কিছুই ছিল না, অথচ আজ সেখানেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের সবচাইতে উঁচু সব ভবন। যেখানে মরুভূমি রূপান্তরিত হয় কৃত্রিম দ্বীপে, আর আকাশ ছুঁয়ে থাকে অজস্র ক্রেন — বিশ্বের প্রতি পাঁচটি ক্রেনের একটি এখন এখানেই কাজ করছে। এটিই দুবাই — এক বিস্ময়কর শহর, এক রহস্যময় নগরী, যা এমন এক গতিতে বেড়ে চলেছে যে মানচিত্রকররাও তার তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বালু থেকে আকাশে
মাত্র ২৭ বছর আগে দুবাইয়ের প্রধান সড়কটি দেখতে ছিল কোনো এক প্রত্যন্ত মফস্বল শহরের রাস্তার মতো। আজ এটি আকাশচুম্বী অট্টালিকা পরিবেষ্টিত মেগাপলিসের প্রধান ধমনী। এই পরিবর্তনের রহস্য একই সাথে সহজ এবং জটিল: তেল, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং এমন একজন মানুষ যিনি অসম্ভবকে বিশ্বাস করেছিলেন — শেখ জায়েদ।

কিন্তু এখানে একটি হেয়ালি আছে: বর্তমানে দুবাইয়ের অর্থনীতিতে তেলের অবদান মাত্র ৫ শতাংশ। বিপুল সম্পদ উত্তরাধিকার সূত্রে পেলেও শহরটি তা হেলায় নষ্ট করেনি, বরং বিনিয়োগ করেছে ভবিষ্যতের জন্য। পর্যটন এবং বিমান চলাচল খাত থেকে আসে আয়ের ২০ শতাংশ — যা 'কালো সোনা' বা তেলের চেয়েও বেশি। দুবাই ঠিক সেই কিশোরের মতো যে বিশাল সম্পত্তি হাতে পেয়েও তা আমোদ-প্রমোদে না উড়িয়ে প্রতিটি মুদ্রাকে বিনিয়োগে রূপান্তর করেছে।

রেকর্ডের শহর
দুবাই 'সবচাইতে' শব্দটির প্রতি ভীষণভাবে আসক্ত। এখানে সবকিছুই হতে হবে প্রথম, বৃহত্তম এবং উচ্চতম:
- বুর্জ খলিফা — ৮২৮ মিটারের এক অদম্য স্পর্ধা। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন, যা ৯৫ কিলোমিটার দূর থেকেও দৃশ্যমান। সূর্যাস্তের সময় যখন আপনি এর ১৪৮তম তলায় দাঁড়াবেন, তখন আইফেল টাওয়ারসহ প্যারিসকে মনে হবে নিতান্তই সাধারণ কোনো মুদি দোকান।
- গেভোরা হোটেল (Gevora Hotel) — বিশ্বের সর্বোচ্চ হোটেল (৩৫৬ মিটার)।
- দুবাই মল — পৃথিবীর বৃহত্তম শপিং মল। ১০ লক্ষ বর্গমিটারেরও বেশি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই মলে রয়েছে ১২০০ দোকান এবং বিশ্বের বৃহত্তম অ্যাক্রিলিক গ্লাস সমৃদ্ধ একটি অ্যাকোয়ারিয়াম — যা ৩৩ মিটার চওড়া।

- কৃত্রিম দ্বীপপুঞ্জ — পাম জুমেইরাহ এবং ২৪০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত 'দ্য ওয়ার্ল্ড' দ্বীপপুঞ্জ, যার প্রতিটি দ্বীপের নাম রাখা হয়েছে কোনো না কোনো দেশের নামে। রাশিয়ানরা ইতিমধ্যে 'রোস্তভ-অন-ডন', 'ইয়েকাতেরিনবুর্গ' এবং 'সাইবেরিয়া' নামের দ্বীপগুলো কিনে নিয়েছেন।
সীমানাহীন বিলাসিতা
দুবাই এমন এক শহর যেখানে বিলাসিতাকে আড়াল করা হয় না, বরং ঘটা করে প্রদর্শন করা হয়। ১৯৬৮ সালে এখানে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩টি। আজ সেই সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি, আর সেগুলো কী সব গাড়ি! ফেরারি, পোরশে, বুগাত্তি এখানে গরম তেলের লুচির মতো বিক্রি হয়। গাড়ির নাম্বারের দাম মাঝেমধ্যে গাড়ির দামকেও ছাড়িয়ে যায়: আবুধাবিতে '০০৩' নম্বরটি ২ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছিল, আর একক সংখ্যার একটি নম্বর বিক্রি হয়েছিল ১২ মিলিয়ন ডলারে!
স্বর্ণের বাজার দুবাইয়ের আভিজাত্যের আরেকটি প্রতিচ্ছবি। এখানে আপনি ৫৮ কেজি ওজনের একটি আংটি দেখতে পাবেন, যা গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছে। দুবাইতে স্বর্ণ কেবল অলঙ্কার নয় — এটি এক জীবনধারা।
শিল্পকর্মের মতো হোটেল
বুর্জ আল আরব — বিখ্যাত 'পাল তোলা নৌকা' আকৃতির এই ভবনটি বিশ্বের একমাত্র ৭-তারকা হোটেল। ৩২১ মিটার উঁচু এই হোটেলের অলিন্দ বিশ্বের সর্বোচ্চ এবং এর অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় ১৮০০ বর্গমিটার সোনা ব্যবহার করা হয়েছে — যা দিয়ে মোনালিসার ৪৬ হাজার ছবি মুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এখানে এক রাত যাপনের খরচ শুরু হয় ১০০০ ডলার থেকে।
তবে কৃত্রিম দ্বীপগুলোতে গেলেই আসল জাদু শুরু হয়। পানির ওপর ভাসমান ভিলাগুলোর জ্যাকুজিতে রয়েছে স্বচ্ছ মেঝে — আপনি যখন পানিতে শুয়ে থাকবেন, আপনার নিচ দিয়ে মাছেরা সাঁতরে বেড়াবে। 'সুইডেন' বা 'বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা'র মতো দ্বীপের ভিলাগুলোর দাম ২০ মিলিয়ন ডলার — যা অনেকটা বালিতে বসবাস করার মতো হলেও সাথে থাকছে নিউ ইয়র্কে যাওয়ার টেলিপোর্ট ব্যবস্থা।
নিশাচর দুবাই

সূর্য ডুবলেই শহরটি অন্য এক মহাবিশ্বে পরিণত হয়। দুবাই ক্যানাল, দেড় বছর আগেও যার কোনো অস্তিত্ব ছিল না, এখন আলোর রোশনাইয়ে ঝলমল করে। বুর্জ খলিফার ঝর্ণা প্রদর্শন — এক বিশাল এবং বিনামূল্যে উপভোগ করার মতো দৃশ্য যেখানে জল, আলো আর সংগীতের এক অপূর্ব সিম্ফনি তৈরি হয়।
তাছাড়া ছাদের ওপর এমন সব টেরাস আছে যেখান থেকে এই স্বপ্নের শহরের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। হোটেলের খোলা চত্বরে বসে এক গ্লাস প্রসিকোতে চুমুক দিয়ে দুবাইয়ের লক্ষ লক্ষ প্রদীপের জ্বলে ওঠা দেখা সত্যিই এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
মরুভূমি ও মরুদ্যান
কিন্তু দুবাই মানেই কেবল কাঁচ আর কংক্রিট নয়। মরুভূমির হৃদয়ে, যেখানে জল থাকার কথা নয়, সেখানে জেগে উঠেছে কৃত্রিম সব হ্রদ। কৃত্রিম হলেও এর সৌন্দর্য কোনো অংশে কম নয়। সূর্যাস্তের সময় বালিয়াড়িগুলো যখন রক্তিম হয়ে ওঠে, তখন উপলব্ধি করা যায়: মানুষ মরুভূমিতে শহর গড়তে পারে, কিন্তু খোদ মরুভূমিকে জয় করা অসম্ভব।
বালুর ওপর গড়ে তোলা ব্যক্তিগত পোলো মাঠগুলো প্রমাণ করে যে দুবাইয়ের অভিধানে 'অসম্ভব' বলে কোনো শব্দ নেই। ৪৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক খাতপুর পরিবার মরুভূমির মাঝখানে একটি নয়, তিনটি পোলো মাঠ তৈরি করেছে। নিখুঁত সবুজ ঘাস, পেশাদার ঘোড়া এবং রালফ লরেনের পোলো টি-শার্ট পরা অতিথি — সব কিছুই ঠিক ইংল্যান্ডের মতো, কেবল চারপাশে ঘিরে আছে মরুভূমির বালু।

আত্মাহীন শহর?
অনেকে বলেন দুবাই একটি আত্মাহীন শহর। এখানে কোনো পুরনো শহরের সরু গলি নেই, নেই শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্য। কিন্তু এটা কি সত্যিই কোনো ত্রুটি? দুবাই একটি নবীন শহর এবং এর ইতিহাস বর্তমান সময়েই রচিত হচ্ছে। ৪০ বছর আগেও এখানকার মানুষ ছিলেন সাধারণ জেলে আর মুক্তা শিকারি, আর আজ তারা সুপারকার এবং গগনচুম্বী অট্টালিকার জগতে বাস করছেন।
দুবাই যেন বিশ্বের বিভিন্ন শহরের একটি ধাঁধা। এখানে লন্ডন, সিঙ্গাপুর আর মায়ামির প্রতিটি টুকরো খুঁজে পাওয়া যায়। এটি এমন এক বিশ্বজনীন শহর যেখানে সীমানা মুছে যায় এবং সংস্কৃতির মিলন ঘটে। স্থানীয়রা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৫ শতাংশ এবং তারা নিজেদের ঘরেও এখন ইংরেজিতে কথা বলেন। একে কি কেবল একটি আরব শহর বলা যায়? না, এটি ভবিষ্যতের শহর যা আমাদের চোখের সামনে গড়ে উঠছে।
কেন যাবেন?
দুবাই মানেই উষ্ণতা, সমুদ্র, নিরাপত্তা (পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ শহর), তারকাদের জন্য গোপনীয়তা এবং অফুরন্ত বিনোদন। এটি এমন এক জায়গা যেখানে প্রতি বছর ফিরে আসা যায় এবং প্রতিবারই অবাক হতে হয়: শহরটি কতটা বদলে গেছে!

এখানে অনেক কিছু নিষিদ্ধ — প্রকাশ্যে চুম্বন, হাত ধরা বা ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো কড়াকড়ি চোখে পড়ে না, আর এই বৈপরীত্যই দুবাইকে এতোটা আকর্ষণীয় করে তোলে। এমন এক শহর যেখানে ঐতিহ্যের সাথে মিশেছে আধুনিকতা, যেখানে মরুভূমি সাগর হয়ে ওঠে আর অসম্ভব পরিণত হয় বাস্তবে।
দুবাই কেবল একটি শহর নয়। এটি মানুষের অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রমাণ। আর যতক্ষণ এখানে ক্রেনগুলো সচল থাকবে, যতক্ষণ পরবর্তী 'সবচাইতে উঁচু' ভবনটি গড়ে উঠবে এবং মরুভূমিতে মরুদ্যান ফুটবে — ততক্ষণ দুবাই বিশ্বকে অবাক করে চলতেই থাকবে।

একবার ঘুরে আসুন। নিজের চোখে দেখুন। কারণ কোনো ছবিই এই স্বপ্নের শহরে ঘটে চলা উম্মাদনার সামান্য অংশও ফুটিয়ে তুলতে পারে না।





