সহস্রাব্দ ধরে মানুষ বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান ও বিশেষ মানসিক স্তরে পৌঁছানোর লক্ষে ড্রামের ছন্দবদ্ধ তালের ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু এই পুনরাবৃত্ত শব্দের প্রভাবে মস্তিষ্কের ভেতরে ঠিক কী ঘটে—এবং কেন কেউ কেউ এতে গভীর উপলব্ধি লাভ করেন অথচ অন্যরা কিছুই অনুভব করেন না?
বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা নিয়ন্ত্রিত গবেষণাগারে এই বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ গবেষণায় এমন ২৭ জন স্বেচ্ছাসেবী অংশ নিয়েছিলেন যাদের আগে কখনও কোনো গভীর বিচ্ছিন্ন মানসিক অবস্থার অভিজ্ঞতা ছিল না। অংশগ্রহণকারীরা ১২ মিনিট ধরে হয় নিরবচ্ছিন্ন ছন্দের ড্রামের শব্দ অথবা অসংলগ্ন শব্দক্রম শুনেছিলেন। এ সময় ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাফি (ইইজি) যন্ত্রের সাহায্যে তাদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা রেকর্ড করা হয় এবং বিশেষ প্রশ্নাবলীর মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পরিবর্তনগুলো যাচাই করা হয়।
অ্যানালস অফ দ্য নিউ ইয়র্ক একাডেমি অফ সায়েন্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণার ফল বলছে, বিশৃঙ্খল শব্দের তুলনায় ছন্দবদ্ধ উদ্দীপনা মানুষের মধ্যে একাত্মতা ও সংহতির বোধ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে যাদের মধ্যে নিজস্ব অনুভূতি, সংগীত বা কল্পনাপ্রসূত ভাবনায় পুরোপুরি মগ্ন হওয়ার প্রবণতা (trait absorption) বেশি, তাদের ওপর এর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। এই অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে শারীরিক অনুভূতির পরিবর্তন, 'আমি'র গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়া এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মতো বিষয়গুলো বেশি দেখা গেছে।
মজার ব্যাপার হলো, ড্রামের ছন্দ মস্তিষ্কের কার্যকলাপে সামঞ্জস্য বা সিনক্রোনাইজেশন বাড়িয়ে দিলেও সেই মাত্রার ওপর অভিজ্ঞতার গভীরতা সরাসরি নির্ভর করেনি। সহজ কথায়, মস্তিষ্ক বাইরের ছন্দের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলেও তার মানে এই নয় যে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেতনার কোনো বিশেষ স্তরে পৌঁছে যাবে।
গবেষণার লেখক—রাকেল অ্যাপারিসিও-তেরেস, সামান্থা লোপেজ-মোচালেস, মার্গারিটা দিয়াজ-আন্দ্রেউ এবং কার্লেস এসকেরা—ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। ছন্দ হয়তো উপলব্ধির পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবে ব্যক্তির নিজস্ব প্রবণতা এবং মগ্ন হওয়ার ক্ষমতাই এখানে মূল ভূমিকা পালন করে।
মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত 'প্রিডিক্টিভ প্রসেসিং' তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একটি পুনরাবৃত্ত ছন্দ সময়ের অনিশ্চয়তা কমিয়ে দিতে পারে: এতে মস্তিষ্কের জন্য পরবর্তী সংকেত অনুমান করা এবং বিভিন্ন ইন্দ্রিয় থেকে আসা তথ্যগুলোকে একীভূত করা সহজ হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে, চেতনা কেবল নিউরাল সিনক্রোনাইজেশনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয় না। এর ওপর প্রত্যাশা, মনোযোগ, অতীত অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের মতো উচ্চতর স্তরের প্রক্রিয়াকরণও প্রভাব ফেলে।
একে একটি অর্কেস্ট্রার বাদকদের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। একটি সাধারণ ছন্দ সবাইকে একসাথে বাজাতে সাহায্য করে, কিন্তু কেবল যিনি সংগীতে পুরোপুরি মগ্ন হন, তিনিই সেই মুহূর্তটি অনুভব করতে পারেন যখন বাদক ও সুরের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচে যায়।
এই গবেষণাটি দেখায় যে, অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থা কেবল ধ্যান বা কোনো বিশেষ পদার্থের প্রভাবে নয়, বরং শব্দ, পুনরাবৃত্তি এবং ছন্দের মতো সাধারণ বাহ্যিক কাঠামোর মাধ্যমেও তৈরি হতে পারে। আমাদের চারপাশের জগতের গাণিতিক বা ছন্দময় বিন্যাসের প্রতি আমাদের মস্তিষ্ক আশ্চর্যজনকভাবে সংবেদনশীল।
তবে এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে: অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল বেশ কম এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলো যাচাই করা হয়নি। ড্রামের ছন্দ কীভাবে মস্তিষ্কের সাথে ক্রিয়া করে এবং কেন এটি কারো কাছে কেবলই একটি শব্দ আর কারো কাছে বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে দেখার দুয়ার হয়ে ওঠে, তা বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।



