দক্ষিণ কোরিয়ার প্রকৌশলীরা যেভাবে মানুষের শারীরিক কাজ রপ্ত করার জন্য রোবটদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন

লেখক: Tatyana Hurynovich

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রকৌশলীরা যেভাবে মানুষের শারীরিক কাজ রপ্ত করার জন্য রোবটদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন-1
এই ছবিটি কেবল চিত্রণের জন্য।

দক্ষিণ কোরিয়ার স্টার্টআপ RLWRLD কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রশিক্ষণের একটি অনন্য প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা হিউম্যানয়েড রোবটদের মানুষের কাছ থেকে জটিল শারীরিক দক্ষতা রপ্ত করতে সক্ষম করে তুলবে। সিউলের ফাইভ-স্টার হোটেলগুলোতে বর্তমানে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার চলছে।

যখন সারা বিশ্ব জেনারেটিভ নিউরাল নেটওয়ার্কের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রকৌশলীরা রোবটদের দিয়ে মানুষের মতো নিখুঁতভাবে দৈনন্দিন শারীরিক কাজ করানোর এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন। RLWRLD-এর মূল দর্শন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিছক সিমুলেশনের বদলে সরাসরি মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

হোটেলের কর্মীরাই এখন যন্ত্রের শিক্ষক

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানীর অন্যতম অভিজাত ও বিখ্যাত লোটে হোটেল সিউলে এই পাইলট প্রকল্পটি চালু করা হয়েছে। হোটেলের সাধারণ কর্মী—যেমন হাউসকিপার, রান্নাঘরের সহকারী ও সার্ভিস কর্মীরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যদাতার (ডেটা ডোনার) ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

এই পরীক্ষাটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এর প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন বেশ জটিল। হোটেলের কর্মীরা তাদের মাথায়, বুকে এবং হাতে বিশেষ রেকর্ডিং ডিভাইস বা ক্যামেরা পরিধান করেন। এরপর তারা তাদের দৈনন্দিন সাধারণ কাজগুলো সম্পাদন করেন—যেমন নির্দিষ্ট নিয়মে ন্যাপকিন ভাঁজ করা, টেবিল সরঞ্জাম মোছা, গুদাম থেকে মালামাল বহন করা এবং ডিসপ্লেতে পণ্যগুলো সযত্নে সাজিয়ে রাখা।

এই প্রতিটি কাজ অত্যন্ত খুঁটিনাটি সহকারে রেকর্ড করা হয়, যাতে এআই পরবর্তীতে মানুষের মতোই নিখুঁতভাবে সেগুলো সম্পাদন করতে পারে।

ভিআর হেডসেট এবং স্মার্ট গ্লাভস: যেভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে

নিউরাল নেটওয়ার্ক যাতে মানুষের নড়াচড়াগুলো সত্যিকার অর্থেই বুঝতে পারে, সেজন্য RLWRLD-এর প্রকৌশলীরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এক বিশাল সম্ভার ব্যবহার করছেন। শরীরে লাগানো ক্যামেরার পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহের এই প্রক্রিয়ায় আরও ব্যবহার করা হচ্ছে:

  • ভিআর হেডসেট — এগুলো মহাশূন্যে শরীরের অবস্থান এবং দৃষ্টির দিক রেকর্ড করে, যা এআই-কে বুঝতে সাহায্য করে যে কোনো কাজ করার সময় মানুষ কোন বিষয়ের ওপর মনোযোগ দিচ্ছে।
  • সেন্সরযুক্ত বিশেষ গ্লাভস — এগুলো আঙুল এবং কবজির সূক্ষ্ম নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করে হাতের জয়েন্টের সঠিক অবস্থান ও নড়াচড়ার কোণগুলো রেকর্ড করে।
  • গ্রিপ স্ট্রেন্থ সেন্সর — মানুষ কোনো বস্তু কতটুকু শক্তি দিয়ে ধরছে তা এগুলো পরিমাপ করে, যাতে রোবট কোনো ভঙ্গুর জিনিস ভেঙে না ফেলে বা ভারী কিছু হাত থেকে ফেলে না দেয়।

সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ তথ্য বা ডেটা-সেটের ওপর ভিত্তি করেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কার্যত, রোবটটি হাজার হাজার ঘণ্টার ভিডিও দেখছে, হাজার হাজার নড়াচড়া অনুভব করছে এবং এমন সব সূক্ষ্ম বিষয় মনে রাখছে যা একজন পেশাদার কর্মীকে একজন শিক্ষানবিশের থেকে আলাদা করে।

কেন হাতের সূক্ষ্ম নড়াচড়ার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?

RLWRLD-এর নির্মাতারা আত্মবিশ্বাসী যে, হাতের সূক্ষ্ম ও নিখুঁত নড়াচড়াই বর্তমান রোবোটিক্সের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। গুদামে ঘুরে বেড়ানো বা হোটেলের করিডোরে রোবট চালানো শেখানো এখন অনেকটাই সহজসাধ্য হয়ে গেছে। কিন্তু একটি যন্ত্রকে দিয়ে নিখুঁতভাবে ন্যাপকিন ভাঁজ করানো, বাসনপত্র ঝকঝকে করে মোছা বা কোনো ভঙ্গুর জিনিস অত্যন্ত সাবধানে বহন করানোই হলো আসল চ্যালেঞ্জ।

সংস্থাটি জোর দিয়ে বলছে যে, কোনো বস্তু সাবধানে ধরা, শক্তভাবে ধরে রাখা এবং সঠিকভাবে স্থানান্তর করার ক্ষমতাই হবে রোবটদের ব্যাপক ব্যবহারের মূল চাবিকাঠি। হাতের কাজের এই নিখুঁত দক্ষতা ছাড়া হিউম্যানয়েড রোবটগুলো কেবল প্রযুক্তি মেলার দামী খেলনা হয়েই রয়ে যাবে।

এই ধরনের রোবট কোথায় কাজ করবে?

RLWRLD যে প্রযুক্তি তৈরি করছে তার প্রয়োগ কেবল হোটেল ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে মানুষের অভিজ্ঞতায় প্রশিক্ষিত এই রোবটগুলো যেসব ক্ষেত্রে কাজ করতে পারবে:

  • গুদাম ও শিল্প কারখানায় — সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ সংযোজন, ভঙ্গুর পণ্য বাছাই এবং প্যাকিংয়ের কাজ করতে পারবে।
  • হোটেল ও রেস্তোরাঁয় — টেবিল সাজানো, ঘর পরিষ্কার করা এবং রান্নাঘরে সাহায্য করতে পারবে।
  • ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে — ঘরের কাজে সাহায্য করা, বয়স্কদের যত্ন নেওয়া এবং দৈনন্দিন ঘরকন্নার কাজ সম্পাদন করতে পারবে।

শিল্প খাতের জন্য এর গুরুত্ব কী?

RLWRLD-এর এই প্রকল্পটি রোবট প্রশিক্ষণের পদ্ধতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগে যেখানে প্রকৌশলীরা জটিল অ্যালগরিদম ও সূত্রের মাধ্যমে যন্ত্রের প্রতিটি কাজ প্রোগ্রাম করার চেষ্টা করতেন, এখন এআই সরাসরি মানুষের কাছ থেকে শিখছে—যেখানে কেবল কাজের ফল নয়, বরং কাজ করার পুরো প্রক্রিয়াটিই সব সূক্ষ্মতা সহ নকল করা হচ্ছে।

এই পদ্ধতিটি গবেষণার সময়কে কয়েক বছর কমিয়ে দেবে এবং রোবটকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সত্যিকারের উপকারী সহকারী হিসেবে গড়ে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন শুধু এটুকুই যে, এই প্রযুক্তি কত দ্রুত ফাইভ-স্টার হোটেলের পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে সাধারণ বাজারের জন্য উন্মুক্ত হবে।

24 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • A South Korean startup captures workers’ techniques to develop AI brains for robots

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।