রয়টার্সের প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, জাপানের প্রতি তিনটি প্রতিষ্ঠানের একটি ২০২৬ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে বা ইতিমধ্যে ব্যবহার শুরু করেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল কোনো প্রযুক্তিগত ঝোঁক নয়, বরং দেশের তীব্র শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় একটি সরাসরি পদক্ষেপের প্রতিফলন।
জাপান কয়েক দশক ধরেই জনসংখ্যার হ্রাসের সমস্যার মুখোমুখি: একদিকে বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে তরুণ শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। উৎপাদন, লজিস্টিকস এবং পরিষেবা খাতের কোম্পানিগুলো পণ্যের উৎপাদন মাত্রা এবং মান বজায় রাখতে ক্রমেই অটোমেশনের দিকে ঝুঁকছে। মাঝারি ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের ওপর চালানো রয়টার্সের এই জরিপে দেখা গেছে যে, অটোমোবাইল এবং ইলেকট্রনিক্স খাতে এআই রোবটের প্রতি আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
তবে এ ধরনের ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে বড় অংকের বিনিয়োগ এবং কার্যপ্রণালীতে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। সব প্রতিষ্ঠান একবারে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনে যেতে প্রস্তুত নয়; অনেকেই নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে রোবট পরীক্ষা করার মাধ্যমে পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রকল্প দিয়ে যাত্রা শুরু করছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রায় ১৫ শতাংশ কোম্পানি ইতিমধ্যে সক্রিয়ভাবে এআই রোবট ব্যবহার করছে এবং আরও ১৮ শতাংশ আগামী দুই বছরের মধ্যে এটি চালুর কথা ভাবছে।
মজার বিষয় হলো, জাপানি কোম্পানিগুলো কেবল পশ্চিমা সমাধানগুলোর অনুকরণ করছে না, বরং নিজেদের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেগুলোর অভিযোজন ঘটাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোবটগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হচ্ছে যাতে সেগুলো মানুষের বিকল্প না হয়ে বরং কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারে। এর ফলে অভিজ্ঞ কর্মীদের দক্ষতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি রুটিন কাজগুলোতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতাটি দেখায় যে কীভাবে উন্নত অর্থনীতিগুলো প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। গণ-ছাঁটাইয়ের বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে সতর্ক জাপান ধীরে ধীরে প্রযুক্তির সমন্বয়ের ওপর জোর দিচ্ছে, যেখানে রোবটগুলো কঠোর পরিশ্রমের কাজগুলো করবে আর মানুষ নিয়ন্ত্রণ ও সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং মাঝারি শিল্পগুলোর জন্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ওপর। বড় কর্পোরেশনগুলো ইতিমধ্যে বিপুল বিনিয়োগ করলেও ছোট কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মতো সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
পরিশেষে, জাপানের এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে জনসংখ্যার চাপের মুখে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে রোবটিক্স এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।



