সুইজারল্যান্ডে 'বেতন পর্যটন' বা 'স্যালারি ট্যুরিজম' এর প্রবণতা: অর্থনৈতিক আকর্ষণ ও এর নেপথ্য খরচ

লেখক: Tatyana Hurynovich

সুইজারল্যান্ডে 'বেতন পর্যটন' বা 'স্যালারি ট্যুরিজম' এর প্রবণতা: অর্থনৈতিক আকর্ষণ ও এর নেপথ্য খরচ-1

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের অর্থনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় 'বেতন পর্যটন' (বা আয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে শ্রম অভিবাসন) শব্দটি বেশ জোরালোভাবে জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর অনেক বাসিন্দা এবং বিশ্বজুড়ে দক্ষ পেশাদারদের কাছে সুইজারল্যান্ড বর্তমানে একটি অনন্য অর্থনৈতিক আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত। তবে ব্যাংক স্টেটমেন্টের লোভনীয় অংকের আড়ালে লুকিয়ে আছে আইনি সীমাবদ্ধতার এক জটিল জাল, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং নানাবিধ রাজনৈতিক বিতর্ক।

১. সুইজারল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে ‘বেতন পর্যটন’ আসলে কী?

'বেতন পর্যটন' বলতে সাধারণত এমন এক কৌশলকে বোঝায় যেখানে একজন ব্যক্তি শুধুমাত্র উচ্চ বেতন এবং সুইস ফ্রাঙ্কের (CHF) শক্তিশালী বিনিময় হারের আশায় সুইজারল্যান্ডে একটি চাকরি (বা রিমোট কাজের চুক্তি) পেতে চান। এক্ষেত্রে তারা প্রায়ই তাদের বসবাসের স্থানটি পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে রাখেন যেখানে জীবনযাত্রার খরচ তুলনামূলক অনেক কম।

এই প্রবণতা মূলত তিনটি প্রধান রূপে দেখা যায়:

  • সীমান্তবর্তী কর্মী (ফ্রন্টালিয়ার্স / গ্রেনজগ্যাংগার): ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নাগরিক যারা ফ্রান্স, জার্মানি বা ইতালির সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বাস করেন এবং প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে কাজের জন্য সুইজারল্যান্ডে যাতায়াত করেন।
  • দক্ষ জনশক্তির স্থানান্তর: আইটি, ফার্মাসিউটিক্যাল বা ফিন্যান্স খাতের বিশেষজ্ঞরা যারা সাময়িকভাবে ১ থেকে ৩ বছরের জন্য পুঁজি জমা করতে সুইজারল্যান্ডে আসেন এবং পরবর্তীতে নিজ দেশে ফিরে যান।
  • ছদ্ম-রিমোট কাজ: বিদেশের বিশেষজ্ঞরা নিজ দেশে অবস্থান করেই সুইজারল্যান্ডের কোনো কোম্পানির সাথে কাজের চুক্তি করার চেষ্টা করেন (যা কর আবাসিকতা এবং সামাজিক বীমা বিধিমালার কারণে আইনিভাবে বেশ জটিল)।

২. অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি: সবাই কেন সুইজারল্যান্ডমুখী হচ্ছেন?

  • উচ্চ বেতন কাঠামো: সুইস ফেডারেল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অফিস (BFS)-এর তথ্যমতে, দেশটিতে মাসিক গড় স্থূল বেতন প্রায় ৬,৭০০ থেকে ৭,০০০ সুইস ফ্রাঙ্ক (আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং বা ফিন্যান্স খাতের বিশেষজ্ঞদের জন্য এই অংক প্রায়শই ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ ফ্রাঙ্ক ছাড়িয়ে যায়)। এই বেতন কাঠামো জার্মানি, ফ্রান্স বা ইতালির তুলনায় অনেক বেশি।
  • শক্তিশালী সুইস ফ্রাঙ্ক: ২০২২-২০২৫ সালে ইউরোজোনে মুদ্রাস্ফীতির প্রেক্ষাপটে সুইস ফ্রাঙ্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং একটি ‘নিরাপদ মুদ্রা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সীমান্তবর্তী কর্মীদের কাছে এর অর্থ হলো ইউরোর হিসাবে তাদের আয় ক্রমাগত বাড়ছে, যা নিজ দেশে তাদের ক্রয়ক্ষমতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
  • করের বিশেষ সুবিধা: কিছু নির্দিষ্ট ক্যান্টনে (যেমন জুগ বা শ্যুইজ) পার্শ্ববর্তী ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় ব্যক্তিগত করের হার বেশ কম। এছাড়া সীমান্তবর্তী কর্মীদের জন্য বিশেষ কর ব্যবস্থা (যেমন উৎসে কর বা কুয়েলেনস্টুয়ার) চালু রয়েছে।

৩. আইনি কাঠামো: বাস্তবে এটি কীভাবে কাজ করে?

সুইজারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়, তবে দেশটি শেনজেন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং ইইউ-এর সাথে মানুষের অবাধ চলাচলের চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী। এই বিষয়টিই বর্তমান ব্যবস্থার মূল নিয়মগুলো নির্ধারণ করে দেয়:

  • জি পারমিট (Grenzgängerbewilligung): এটি মূলত ইইউ নাগরিকদের দেওয়া হয় যারা সুইজারল্যান্ডে কাজ করলেও বিদেশে বসবাস করেন এবং সপ্তাহে অন্তত একবার নিজ বাড়িতে ফিরে যান। এটিই 'বেতন পর্যটন'-এর সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম।
  • বি বা এল পারমিট: যারা আনুষ্ঠানিকভাবে সুইজারল্যান্ডে চলে আসেন তাদের জন্য এটি প্রযোজ্য। ইইউ বা ইএফটিএ বহির্ভূত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য এই পারমিট পাওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং এর জন্য প্রমাণ করতে হয় যে উক্ত পদের জন্য সুইজারল্যান্ড বা ইইউ থেকে কোনো যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি।
  • সামাজিক বীমা ব্যবস্থা: সুইজারল্যান্ড ও ইইউ-র মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী, কর্মীরা সাধারণত যে দেশে কাজ করেন সেই দেশের সামাজিক বীমা ব্যবস্থার আওতায় থাকেন। তবে সীমান্তবর্তী কর্মীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে যা তাদের নিজ দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় থাকার সুযোগ দেয়, ফলে তাদের অনেক সাশ্রয় হয় (সুইজারল্যান্ডে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বীমার খরচ প্রতি মাসে জনপ্রতি ৩০০-৪০০ ফ্রাঙ্ক থেকে শুরু হয়)।

৪. মুদ্রার উল্টো পিঠ: ঝুঁকি ও নেপথ্য ব্যয়

‘ফ্রাঙ্ক আয় করে ইউরোতে ব্যয় করার’ ধারণাটি কাগজে-কলমে নিখুঁত মনে হলেও বাস্তবে এটি বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়:

  • সুইজারল্যান্ডে জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়: কোনো কর্মী যদি সুইজারল্যান্ডেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তার উচ্চ বেতনের বড় অংশই বাধ্যতামূলক ব্যয়ে শেষ হয়ে যায়; যেমন স্বাস্থ্য বীমা, অত্যধিক বাড়ি ভাড়া (বিশেষ করে জুরিখ, জেনেভা বা জুগে), দামি নিত্যপণ্য এবং যাতায়াত। দেশের ভেতরে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা সবসময় ঘোষিত বেতনের সমানুপাতিক হয় না।
  • তীব্র আবাসন সংকট: সুইজারল্যান্ডের বড় শহরগুলোতে ফাঁকা অ্যাপার্টমেন্টের হার প্রায়শই ১ শতাংশের নিচে থাকে। আবাসন খুঁজে পাওয়া এখন যেমন কঠিন তেমনি ব্যয়বহুল, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সামাজিক উত্তেজনা ও অসন্তোষ সৃষ্টি করছে।
  • রাজনৈতিক চাপ ও বিতর্ক: অভিবাসন এবং অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার সুরক্ষার বিষয়টি দেশটিতে বরাবরই সংবেদনশীল। সুইস ট্রেড ইউনিয়ন এবং কিছু রাজনৈতিক দল নিয়মিতভাবে ‘বেতন ডাম্পিং’ এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর কঠোর নজরদারির দাবি তুলে আসছে। যদিও মানুষের অবাধ চলাচলের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবগুলো এখনও পাস হয়নি, তবে অভিবাসন নীতি কঠোর করার আলোচনা জোরালো হচ্ছে।
  • রিমোট কাজের সীমাবদ্ধতা: ট্যাক্স জটিলতা এবং শ্রম আইনের প্রয়োগের ভয়ে সুইস কোম্পানিগুলো দেশের বাইরে অবস্থান করা কর্মীদের নিয়োগ দিতে সাধারণত অনাগ্রহী। কোনো ইওআর (EOR) প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়া রিমোট কাজের মাধ্যমে ‘বেতন পর্যটন’ করা প্রায় অসম্ভব, যা অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক লাভের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।

৫. লাভ এবং ক্ষতি কার?

কারা লাভবান হচ্ছেন:

  • ইইউ দেশগুলোর সেই সব দক্ষ পেশাদাররা যারা প্রতিদিন দীর্ঘ যাতায়াতে প্রস্তুত (সীমান্তবর্তী কর্মী), বিশেষ করে উচ্চ বেকারত্ব থাকা অঞ্চলের মানুষ (যেমন ফ্রান্সের হাউট-স্যাভয় বা ইতালির লম্বার্ডি)।
  • সুইজারল্যান্ডের কোম্পানিগুলো, যারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মানসম্পন্ন কাজের বিনিময়ে উচ্চ বেতন দিয়ে সেরা মেধাবীদের নিয়োগ করতে পারছে।

কারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন:

  • ইইউ বা ইএফটিএ বহির্ভূত দেশের নাগরিকরা, যাদের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আইনিভাবে দেশটিতে বসবাস করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
  • সুইজারল্যান্ডের আবাসন বাজার, যা উচ্চ বেতনভোগী পেশাদারদের অতিরিক্ত আগমনে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।
  • স্বয়ং সেই ‘বেতন পর্যটকরা’ যারা জীবনযাত্রার ব্যয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না এবং প্রতিদিনের দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে শারীরিক ও মানসিক অবসাদে ভোগেন।

9 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।