Stanford HAI ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল তাদের বার্ষিক এআই ইনডেক্স রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যা বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের এআই মডেলগুলোর মধ্যে পারফরম্যান্সের যে বিশাল ব্যবধান ছিল, তা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ২০২৩ সালে যেখানে এই ব্যবধান ছিল ১৭.৫ থেকে ৩১.৬ শতাংশ পয়েন্ট, সেখানে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে আমেরিকার সেই একচ্ছত্র আধিপত্য এখন বিলীন হওয়ার পথে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই পরিবর্তনের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় মডেল Anthropic's Claude Opus 4.6 এবং চীনের সেরা উদ্ভাবন ByteDance Dola-Seed-2.0-Preview-এর মধ্যে এরিনা রেটিংয়ে ব্যবধান মাত্র ৩৯ পয়েন্ট বা ২.৭ শতাংশ। এটি এতটাই সামান্য যে একে পরিসংখ্যানগত ত্রুটির সীমার মধ্যে ধরা যেতে পারে। অথচ ২০২৩ সালের মে মাসে OpenAI's GPT-4 মডেলটি ৩০০ পয়েন্টেরও বেশি ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। ২০২৫ সালের শুরু থেকেই এই দুই দেশের মডেলগুলো শীর্ষস্থানের জন্য একে অপরকে বারবার টক্কর দিচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনের DeepSeek-R1 মডেলটি মার্কিন সিস্টেমগুলোর সমকক্ষ হয়ে ওঠার মাধ্যমে তাদের অ্যালগরিদমিক দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে।
তবে এই অগ্রগতির নেপথ্যে বিনিয়োগের একটি ভিন্ন সমীকরণ কাজ করছে। ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেসরকারি এআই খাতে ২৮৫.৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা চীনের সরকারিভাবে নিবন্ধিত ১২.৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ২৩ গুণ বেশি। কিন্তু Stanford HAI সতর্ক করেছে যে, চীনের এই হিসাবটি প্রকৃত চিত্রের প্রতিফলন নয়। ধারণা করা হয়, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনের রাষ্ট্রীয় তহবিলগুলো এআই সংস্থাগুলোতে প্রায় ১৮৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সহজ কথায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম অর্থ ব্যয় করেই চীন পারফরম্যান্সে সমতা অর্জন করেছে, যা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দক্ষতার দিক থেকে তাদের একটি বড় বিজয়।
অন্যান্য সূচকের দিকে তাকালে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও শীর্ষস্থানীয় মডেল তৈরির সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো ৫৯টি উল্লেখযোগ্য মডেল প্রকাশ করেছে, যেখানে চীনের সংখ্যা ৩৫টি। যদিও এক বছরের ব্যবধানে চীনের এই উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। উচ্চ-প্রভাবশালী পেটেন্ট এবং ডেটা সেন্টারের সংখ্যার দিক থেকেও আমেরিকা এগিয়ে, যেখানে তাদের প্রায় ৫,৫০০টি ডেটা সেন্টার রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি।
তবে চীন এখন সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এআই সংক্রান্ত প্রকাশনার ২৩.২ শতাংশ এবং সাইটেশনের ২০.৬ শতাংশ এখন চীনের দখলে, যেখানে আমেরিকার সাইটেশন হার ১২.৬ শতাংশ। পেটেন্ট আবেদনের ক্ষেত্রেও চীন বিশ্বজুড়ে মোট আবেদনের ৬৯.৭ শতাংশ দখল করে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো শিল্প রোবট স্থাপন—গত রিপোর্ট অনুযায়ী চীন ২,৯৫,০০০টি রোবট স্থাপন করেছে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা মাত্র ৩৪,২০০। রোবোটিক্সের এই ব্যাপক প্রয়োগ চীনের বাস্তব অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
দক্ষিণ কোরিয়া এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় তৃতীয় অবস্থানে থেকে তাদের নিজস্ব একটি বিশেষ ক্ষেত্র বা 'নিশ' তৈরি করেছে। মাথাপিছু পেটেন্ট সংখ্যার দিক থেকে তারা বিশ্বে শীর্ষে অবস্থান করছে। এটি প্রমাণ করে যে, উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কেবল বিশাল আকার বা জনসংখ্যাই সব নয়, বরং প্রযুক্তির নিবিড়তা এবং উদ্ভাবনের তীব্রতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনের কার্যপদ্ধতি মূলত উন্মুক্ত বেঞ্চমার্ক এবং প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তবে তথ্যের অসামঞ্জস্যতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। OpenAI, Anthropic এবং Google-এর মতো মার্কিন কোম্পানিগুলো এআই-এর দায়িত্বশীল বিকাশ এবং স্বচ্ছতা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অন্যদিকে, চীনা ল্যাবরেটরিগুলো মূলত তাদের উৎপাদনশীলতা এবং প্রকাশনার পরিমাণের ওপর জোর দেয়। এর ফলে একটি ধারণাগত পার্থক্য তৈরি হয়: আমরা একদিকে আমেরিকার নিরাপত্তা কেন্দ্রিক আখ্যান এবং অন্যদিকে চীনের উৎপাদনশীলতা কেন্দ্রিক আখ্যান দেখতে পাই, তবে উভয়ই অসম্পূর্ণ।
এই বহুমুখী প্রতিযোগিতার অর্থ হলো, আগে এআই মডেলে আমেরিকার আধিপত্যকে একটি স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু এখন এটি দ্রুত উদ্ভাবন এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যখন দুটি সিস্টেম সমানভাবে শক্তিশালী হয়, তখন তারাই জয়ী হয় যারা দ্রুত উন্নতি করতে পারে, কম খরচে প্রযুক্তির বিস্তার ঘটাতে পারে এবং একাডেমিক বেঞ্চমার্কের চেয়ে শিল্প প্রয়োগে বেশি মনোযোগ দেয়। বর্তমানে ঠিক এই প্রবণতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবধান কমে আসা তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রথমত, চিপ সরবরাহের বৈশ্বিক চেইন এখন ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধের প্রধান ময়দানে পরিণত হয়েছে। এখানে মার্কিন রফতানি নিয়ন্ত্রণের কঠোর নীতির বিপরীতে চীন নিত্যনতুন উদ্ভাবনী উপায়ে সেই বাধা অতিক্রম করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের দিকে ঝুঁকছে। ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো তাদের নিজস্ব এআই উদ্যোগ ও কৌশল তৈরি করছে, যাতে তারা কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
তৃতীয়ত, বেঞ্চমার্কগুলোর স্বাধীন যাচাইকরণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যখন উভয় পক্ষই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে, তখন নিরপেক্ষভাবে সত্য জানার উপায় কী? পরিশেষে, সক্ষমতার এই ক্রমবর্ধমান মিলন মানে হলো উন্নত সিস্টেমের ত্রুটি, পক্ষপাতিত্ব এবং নজরদারি বা ভুল তথ্যের কাজে ব্যবহারের ঝুঁকিও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, যা বিশ্ববাসীর জন্য উদ্বেগের কারণ।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালের এআই ইনডেক্স কেবল গাণিতিক ব্যবধান কমে আসাকেই নির্দেশ করে না, বরং এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সংকেত। এখানে বেসরকারি পুঁজির পরিমাণের মতোই বিনিয়োগের দক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় সমর্থন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এআই জগতে একাধিপত্যের যুগ শেষ হয়ে এখন কৌশলগত প্রতিযোগিতার এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, যেখানে কেবল সম্পদ নয়, বরং বুদ্ধিমত্তা ও সঠিক প্রয়োগই হবে জয়ের চাবিকাঠি।


