মঞ্চ যখন গবেষণাগার: লুক মাম নো কম্পিউটার ইউরোভিশনকে একটি পরীক্ষায় রূপান্তর করছেন

লেখক: Inna Horoshkina One

FURBY অর্গান, FURBIES থেকে তৈরি একটি সঙ্গীতযন্ত্র

আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি বিবিসি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের ইউরোভিশন প্রতিযোগিতার জন্য দেশের প্রতিনিধির নাম ঘোষণা করতে যাচ্ছে। তবে এবারের নির্বাচনটি কোনো সাধারণ পপ তারকার নয়, যা আমরা সচরাচর রেডিওতে শুনে থাকি। এবার মঞ্চে দেখা যাবে 'লুক মাম নো কম্পিউটার' (Look Mum No Computer) প্রকল্পটিকে, যার নেপথ্যে রয়েছেন দক্ষ সংগীতশিল্পী এবং প্রকৌশলী স্যাম ব্যাটল। তিনি মূলত পুরনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি এবং খেলনা দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের বাদ্যযন্ত্র তৈরির জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

এই রোমাঞ্চকর তথ্যটি বিবিসি রেডিও ২-এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'দ্য স্কট মিলস ব্রেকফাস্ট শো'-তে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিবিসির এই অভ্যন্তরীণ বাছাই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল সংগীতের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব মৌলিকত্ব প্রদর্শন করা। এই সিদ্ধান্তটি সংগীত জগতের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্যাম ব্যাটলের এই অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি অংশগ্রহণ নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী শৈল্পিক বিবৃতি। তিনি তার সৃজনশীলতার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক্সও সুরের জাদুকরী উৎস হতে পারে। তার এই অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোভিশনের মঞ্চে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্যাম ব্যাটল তার বিচিত্র সব উদ্ভাবনের জন্য পরিচিত, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • বিখ্যাত 'ফার্বি' খেলনা দিয়ে তৈরি একটি বিশালাকার অর্গান।
  • একটি র‍্যালে চপার সাইকেলের মধ্যে সুচারুভাবে বসানো সিন্থেসাইজার।
  • হাতে তৈরি সার্কিট বোর্ড দিয়ে নির্মিত বিশাল মডুলার দেয়াল।
  • পুরনো গেমবয় কনসোলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা মিউজিক সিস্টেম।

তিনি তার এই বাদ্যযন্ত্র তৈরির প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত যত্নসহকারে ইউটিউবে প্রচার করেন। সেখানে সোল্ডারিং থেকে শুরু করে সার্কিট ডিজাইনের প্রতিটি মুহূর্তকে তিনি একটি সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতে রূপান্তর করেছেন। স্যামের কাছে বাদ্যযন্ত্র তৈরির এই প্রক্রিয়াটি কেবল একটি যান্ত্রিক কাজ নয়, বরং এটি একটি শিল্পকর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিগত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্য ইউরোভিশনের মঞ্চে রেডিও-বান্ধব সুর এবং দর্শনীয় পরিবেশনার মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছিল। লুক মাম নো কম্পিউটারকে প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেওয়া সেই প্রচেষ্টায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এবং সৃজনশীল ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

এই নির্বাচনটি মোটেও কোনো সহজ বা অনুমেয় সিদ্ধান্ত ছিল না। আর ঠিক এই কারণেই এটি সংগীত সমালোচক এবং দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ইউরোভিশন এখন কেবল পপ সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি নতুন নতুন পরীক্ষার একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

স্যাম ব্যাটলের পরিবেশনায় দর্শকরা যা প্রত্যাশা করতে পারেন:

  • মঞ্চেই সরাসরি বাদ্যযন্ত্রের সংযোগ স্থাপন এবং শব্দ তৈরি করা।
  • প্রথাগত আলোকসজ্জার বদলে সার্কিট বোর্ডের নিজস্ব উজ্জ্বলতা।
  • যান্ত্রিক স্পন্দনের মাধ্যমে তৈরি এক অনন্য ছন্দময় অভিজ্ঞতা।

তার প্রতিযোগিতামূলক গানটি এখনও প্রকাশ করা হয়নি, যা দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন দেখার জন্য যে, এই প্রকৌশলী-সংগীতশিল্পী বিশ্বমঞ্চে কী ধরনের শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করেন।

ইউরোভিশন সাধারণত শক্তিশালী কণ্ঠস্বর এবং মনে রাখার মতো সুরের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। তবে লুক মাম নো কম্পিউটার কাজ করেন একটি সুশৃঙ্খল সিস্টেম বা পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে। তার কাছে সংগীত মানেই হলো সূক্ষ্ম প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

তার দর্শনে মঞ্চ হলো একটি গবেষণাগার এবং শব্দ হলো একটি স্পর্শযোগ্য বস্তু। তিনি শব্দের ভৌত রূপ নিয়ে কাজ করেন, যা শ্রোতাদের এক ভিন্নধর্মী এবং নিমগ্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এটি সংগীতের চিরাচরিত সংজ্ঞাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানায়।

এই বিশেষ ঘটনাটি বিশ্ব সংগীতের মানচিত্রে নতুন কী মাত্রা যোগ করল? ইউরোভিশনকে একটি বিশাল বৈশ্বিক অ্যাম্প্লিফায়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মঞ্চে যা কিছু উপস্থাপিত হয়, তা মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

২০২৬ সালে আমরা ইউরোভিশনের মঞ্চে কোনো প্রথাগত পপ সংগীতের কাঠামো দেখব না। বরং আমরা দেখব এমন একজন শিল্পীকে, যিনি আক্ষরিক অর্থেই পুরনো সার্কিট বোর্ড, পরিত্যক্ত খেলনা এবং মেকানিক্যাল যন্ত্রাংশ দিয়ে সুরের মায়াজাল বুনছেন।

যখন বিবিসির মতো একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা একজন পরীক্ষামূলক শিল্পীকে বেছে নেয়, তখন তারা মূলধারার সংগীতের সীমানাকে আরও বিস্তৃত করে। এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, অপ্রচলিত বা ভিন্নধর্মী শিল্প এখন আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়।

এর অর্থ হলো, এখন থেকে সৃজনশীল পরীক্ষা-নিরীক্ষাও মূল মঞ্চের কেন্দ্রে জায়গা করে নিতে পারে। এই ধরনের ঝুঁকি গ্রহণ করা এখন একটি সাহসী সাংস্কৃতিক পদক্ষেপে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, এই ঘটনাটি বিশ্বের সংগীত জগতে এক নতুন ধরনের সাহসের সঞ্চার করেছে।

এটি হলো প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে শব্দ তৈরির সাহস, দর্শকদের প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে যাওয়ার সাহস এবং কেবল শেষ ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে পুরো সৃজনশীল প্রক্রিয়ার অংশ হওয়ার সাহস। স্যাম ব্যাটলের এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ইউরোভিশনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

1 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।