মধ্যবয়সের এক নিখুঁত আবরণ: ‘দ্য ফোর সিজনস’ সিরিজটি আপনাকে হাসাবে, আবার একই সাথে আপনার চোখও ভেজাবে।
কল্পনা করুন যে আপনারা একদল বন্ধু দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে একে অপরের সাথে রয়েছেন। আপনাদের একে অপরের প্রতিটি অভ্যাস থেকে শুরু করে মনের সব গোপন কথা—সবই নখদর্পণে। প্রতি তিন মাস অন্তর সব ব্যস্ততা ফেলে চমৎকার কোনো জায়গায় ভ্রমণে যাওয়াটা আপনাদের এক অলঙ্ঘনীয় রীতি। ছবির মতো হ্রদ, অভিজাত ডিনার, গ্লাসে ওয়াইন আর ন্যান্সি মেয়ার্সের সিনেমার মতো নিখুঁতভাবে ছাঁটা ঘাসের ওপর অলস আড্ডা—সব মিলিয়ে এক স্থিতিশীল পরিণত জীবনের এক মায়াবী ছবি।
কিন্তু এই সুনিপুণভাবে সাজানো ছক থেকে হঠাৎ যদি একটি অংশ খসে পড়ে তবে কী হবে? প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তনের মতো করেই অলক্ষ্যে অথচ চিরতরে ধসে পড়তে শুরু করে সেই সব কিছু, যা এক সময় অটুট মনে হতো।
নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় ড্রামেডি ‘দ্য ফোর সিজনস’ মূলত এই ভঙ্গুর ভারসাম্য নিয়েই আবর্তিত। অ্যালান আল্ডার ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্রের এই আধুনিক রূপান্তরটি তৈরি করেছেন টিনা ফে, ল্যাং ফিশার এবং ট্রেসি উইগফিল্ডের মতো খ্যাতনামা নির্মাতারা, যারা সস্তা আবেগ বাদ দিয়ে চরম সততার সাথে মধ্যবয়সের সংকটকে পর্দার সামনে নিয়ে এসেছেন।
টিনা ফে এবং স্টিভ ক্যারেল অভিনীত নেটফ্লিক্সের এই নতুন সিরিজটি কেবল মধ্যবয়সের সংকট নিয়ে একটি কমেডি নয়। এটি জীবনের সেই সত্যগুলোকে তুলে ধরে যখন আমাদের সাজানো সংসার বা সুখের সম্পর্কে ফাটল ধরতে শুরু করে।
তারকাবহুল এক দল যারা অভিনয়ের সেরাটা দিয়েছেন এবং যা মোটেও মিস করা উচিত নয়।
একবার ভেবে দেখুন: স্টিভ ক্যারেল («দ্য অফিস», «দ্য মর্নিং শো»), টিনা ফে («৩০ রক», «মিন গার্লস»), কোলম্যান ডমিঙ্গো («জেন», «ইউফোরিয়া») এবং উইল ফোর্ট («দ্য লাস্ট ম্যান অন আর্থ») একই ফ্রেমে। এটি কোনো কল্পনা নয়—এটি ২০২৫ সালের নেটফ্লিক্সের অন্যতম প্রতীক্ষিত প্রজেক্ট ‘দ্য ফোর সিজনস’।
পরিচালক জুটি শারি স্প্রিঙ্গার বারম্যান এবং রবার্ট পুলচিনি («দ্য ন্যানি ডায়েরি», «গার্ল») এবং ল্যাং ফিশার («সুপারমার্কেট») মিলে বিশেষ কিছু তৈরি করেছেন—যেখানে প্রথম সিজনের আটটি পর্বের প্রতিটি মাত্র ৩১ মিনিটের হলেও তা দেখার পর রেশ থেকে যায় অনেক দিন।
এমন এক কাহিনী যা সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করে।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বিবাহিত দম্পতি। তাদের বহু বছরের বন্ধুত্ব। আর প্রতি তিন মাস অন্তর সপ্তাহান্তে একত্রিত হওয়ার এক চমৎকার নিয়ম। আপাতদৃষ্টিতে এটি সুখের এক নিখুঁত ফর্মুলা মনে হয়, তাই না?
কিন্তু জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলে: একটি দম্পতি বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। আর এই একটি ফাটল কেবল তাদের দাম্পত্যকেই নয়, বরং তিনটি পরিবারের দীর্ঘদিনের অটুট বন্ধুত্বকেও হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
এখানে কোনো গতানুগতিক চিত্রনাট্য নেই। সিরিজটি কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে না বা কোনো সহজ সমাধানও দেয় না। বরং এটি এমন সব প্রশ্ন তোলে যা আমরা সাধারণত এড়িয়ে যেতে চাই:
- যখন আপনার প্রিয় মানুষগুলো আর একসাথে থাকতে পারে না, তখন কী ঘটে?
- বন্ধুত্বের মূল্যবোধে অমিল দেখা দিলে কি সেই বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব?
- আর সবচাইতে বড় প্রশ্ন: আধুনিক যুগে আসলে ‘সুখে শান্তিতে বসবাস’ করার অর্থ কী?
সূক্ষ্ম রসবোধ এবং ভিভাল্ডির সঙ্গীত।
নির্মাতাদের অন্যতম চমৎকার পছন্দ ছিল এর আবহ সঙ্গীত। অ্যান্তোনিও ভিভাল্ডির বিখ্যাত ‘দ্য ফোর সিজনস’ (১৭২৫ সাল!) এখানে চরিত্রদের মানসিক ঋতুচক্রের রূপক হিসেবে কাজ করেছে। শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম, শরৎ—কেবল প্রকৃতিতেই নয়, মানুষের সম্পর্কের মাঝেও যে এর প্রভাব রয়েছে তা নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
এখানে রসবোধ খুব জোরালো নয়, বরং বেশ শান্ত। এটি কখনও সংলাপের মাঝে থাকা নীরবতায়, কখনও অর্থবহ চাহনিতে, আবার কখনও এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে প্রকাশ পায় যা কাছের বন্ধুদের সাথে ভিন্নমত থাকা যে কেউ সহজেই বুঝতে পারবেন।
দর্শকদের মতে: «সংলাপগুলো এতই প্রাণবন্ত ছিল যে একবারের জন্যও বিরক্তিকর মনে হয়নি»।
৩০ ও ৫০ এর কোঠায় থাকা মানুষদের জন্য জীবনদর্শন।
‘দ্য ফোর সিজনস’ মধ্যবয়সের সংকটের গল্প হলেও এটি প্রথাগত অন্য সিরিজের মতো নয়। এখানে কোনো দামি স্পোর্টস কার কেনা বা কম বয়সী তরুণীদের সাথে প্রেমের সম্পর্কের গল্প নেই।
এখানে রয়েছে জীবন ফুরিয়ে যাওয়ার এক নিঃশব্দ হাহাকার। উপলব্ধি হয় যে ২০ বছর আগে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত হয়তো পুরোপুরি সঠিক ছিল না। দশকের পর দশক চেনা বন্ধুরা হঠাৎ কেমন যেন অচেনা হয়ে যায়। আর সুখ কোনো গন্তব্য নয় বরং এটি প্রতিনিয়ত কাজ করে যাওয়ার নাম।
সিরিজে সমকামী দম্পতির অন্তর্ভুক্তি কোনো বিশেষ ‘এজেন্ডা’ হিসেবে নয়, বরং জীবনের এক স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই দেখানো হয়েছে। তাদের সম্পর্কও সমান্তরালভাবে জটিল, সুন্দর এবং ভঙ্গুর হিসেবেই চিত্রিত হয়েছে।
সাবধান: এটি মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হতে পারে (তবে তা নান্দনিক)।
একটি আগাম তথ্য বা স্পয়লার!
স্টিভ ক্যারেলের অভিনীত চরিত্রটি প্রথম সিজনের শেষ দিকে মারা যায়। দর্শকরা এই ধাক্কাকে «দ্য মর্নিং শো»-এর সাথে তুলনা করছেন। রিভিউগুলোতে অনেকে লিখেছেন, «আমি শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারিনি যে এটি কোনো রসিকতা ছিল না»।
মূলত তার চরিত্রটিই সিরিজের সবচেয়ে মজার এবং আকর্ষণীয় দিকগুলো তৈরি করেছিল। তবে সম্ভবত এই ক্ষতিই বাকি চরিত্রদের এবং দর্শকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে যে জীবনে আসলে কোন বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কেন এটি দেখা উচিত?
এর রেটিংই সব কথা বলে দেয়: আইএমডিবি-তে ৭.২ এবং কিনোপইসকে ৭.২৫। সিরিজটি ইতিমধ্যেই ২০২৫ সালের সেরা কমেডি এবং মেলোড্রামার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
তবে সংখ্যাই সব নয়, সাধারণ মানুষের অনুভূতিই আসল:
«বাইরে থেকে হালকা মনে হলেও, এটি অত্যন্ত মানসম্মত এবং আবেগপূর্ণ একটি সিরিজ»।
«এক বসাতেই সব দেখে ফেলেছি। দারুণ সংলাপ, রসবোধ আর চমৎকার অভিনয়»।
«আমেরিকান স্টাইলে তৈরি হলেও এর পরিশীলতা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো»।
দ্বিতীয় সিজন: গল্পের নতুন মোড়।
যদিও নাম অনুসারে চারটি ঋতুর গল্প শেষ মনে হতে পারে, নেটফ্লিক্স ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় সিজন নবায়ন করেছে। ২০২৬ সালের ২৮ মে ‘দ্য ফোর সিজনস’-এর দ্বিতীয় সিজনের সবগুলো পর্ব নেটফ্লিক্সে একযোগে মুক্তি পায়।
সামনে কী হতে যাচ্ছে? প্রিয়জনকে হারানোর শোক চরিত্রগুলো কীভাবে সামলে উঠবে? সেই বন্ধুত্ব কি এই শোকের মাঝেও টিকে থাকবে? আর সবশেষে তারা কি খুঁজে পাবে তাদের কাঙ্ক্ষিত শান্তির ঋতু?
চূড়ান্ত মতামত।
‘দ্য ফোর সিজনস’ কেবল অবসরে দেখার মতো সিরিজ নয়। এটি জীবনের মাঝপথে দাঁড়িয়ে নিজেকে বোঝার এক গভীর কথোপকথন। বন্ধুত্বের গল্প যা কখনও কখনও এগিয়ে যাওয়ার জন্য শেষ করতে হয়। ভালোবাসার গল্প যা সবসময় জয়ী হয় না। এবং জীবনের গল্প যা সব শেষ হয়ে যাওয়ার পরও অব্যাহত থাকে।
যাদের বয়স ৩০-এর বেশি, যারা কখনও বিবাহিত জীবনে জড়িয়েছেন বা বিচ্ছেদের সম্মুখীন হয়েছেন এবং যারা বন্ধুত্বের গভীরতা বোঝেন, তাদের জন্য এটি দারুণ এক কাজ।
তবে যারা স্রেফ সস্তা বিনোদন বা অতি সহজ গল্পের খোঁজ করছেন, তাদের জন্য এটি না দেখাই ভালো।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই সিরিজ দেখার পর যদি আপনার পুরোনো কোনো বন্ধুকে ফোন দিতে ইচ্ছে করে বা প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরতে চান—তবে বুঝে নেবেন সিরিজটি সফল হয়েছে।



