মহাবিশ্বের উৎপত্তির প্রচলিত ব্যাখ্যায় মহাবিস্ফোরণ বা দ্রুত প্রসারণের পর্যায়টিকে (ইনফ্লেশন) আর আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। আইনিস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে কোনো কৃত্রিম 'ইনফ্ল্যাটন' ক্ষেত্র বা বিশেষ কোনো বাহ্যিক উপাদান যোগ না করেই এখন এই মহাজাগতিক প্রক্রিয়াটিকে গাণিতিকভাবে বোঝা সম্ভব হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মহাবিশ্বের এই প্রসারণ প্রক্রিয়াটি প্রকৃতির মৌলিক নিয়মাবলির মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াটারলু (University of Waterloo) এবং পেরিমিটার ইনস্টিটিউটের (Perimeter Institute) একদল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এই যুগান্তকারী গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। অধ্যাপক নিয়ায়েশ আফশোর্দি (Niayesh Afshordi) এবং তাঁর সহকর্মীরা 'কোয়ান্টাম বাউন্স' বা 'কোয়ান্টাম প্রতিক্ষেপণ' নামক একটি নতুন মডেল উপস্থাপন করেছেন। এই মডেলটি মূলত 'কোয়াড্রাটিক কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি' (Quadratic Quantum Gravity) বা দ্বিঘাত কোয়ান্টাম মহাকর্ষের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
পদার্থবিজ্ঞানীদের এই দলটি প্রথাগত 'সিঙ্গুলারিটি' বা পরম বিন্দুর ধারণাকে প্রতিস্থাপন করে এই নতুন মডেলটি সামনে এনেছেন। দীর্ঘকাল ধরে মহাবিশ্বের শুরুতে একটি অসীম ঘনত্বের বিন্দুর অস্তিত্ব কল্পনা করা হতো, যা অনেক গাণিতিক জটিলতার সৃষ্টি করত। নতুন এই তত্ত্ব সেই জটিলতা দূর করে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বের এক নতুন এবং আরও বাস্তবসম্মত দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
নতুন এই গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের এই মহাবিশ্ব হয়তো শূন্য থেকে হঠাৎ করে বা 'অলৌকিকভাবে' সৃষ্টি হয়নি। বরং এটি মহাজাগতিক বিবর্তনের আগের একটি পর্যায়ের সংকোচনের চূড়ান্ত ফলাফল হতে পারে। অর্থাৎ, পূর্ববর্তী একটি মহাবিশ্ব সংকুচিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছানোর পর পুনরায় প্রসারিত হতে শুরু করেছে, যা বর্তমান মহাবিশ্বের জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে পদার্থবিজ্ঞানে প্রসারণের শুরুতে অসীম ঘনত্বের যে সমস্যাটি ছিল, এই তত্ত্ব তার একটি যৌক্তিক সমাধান প্রদান করে। আগে যেটিকে পদার্থবিজ্ঞানের একটি সমাধানহীন ত্রুটি বা 'ম্যাথমেটিক্যাল ক্যাটাস্ট্রফি' হিসেবে বিবেচনা করা হতো, কোয়ান্টাম বাউন্স তত্ত্ব সেই অসীম ঘনত্বের অনুপস্থিতিকে গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে প্রকৃতির নিয়মগুলো কোনো চরম বিন্দুতেও ভেঙে পড়ে না।
মহাবিস্ফোরণকে একটি অসীম ঘনত্ব ও তাপমাত্রার বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটি হিসেবে দেখার প্রথাগত ধারণাটি এখন বিজ্ঞানীদের কাছে দ্রুত তার গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। শীর্ষস্থানীয় মহাকাশবিজ্ঞানীদের প্রকাশিত নতুন তথ্য অনুসারে, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে একটি চক্রাকার প্রক্রিয়ার অংশ। সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এই সমন্বয় দাবি করে যে স্থান-কাল বা স্পেস-টাইম কন্টিনুয়ামের কোনো পরম 'শুরু' নেই। বরং আমরা যা দেখছি তা হলো একটি চরম সংকোচনের পরবর্তী প্রসারণ।
এই গবেষণার মূল সাফল্য হলো লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি (Loop Quantum Gravity) কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ। এই মডেলে স্থান-কালের জ্যামিতি নিজেই বিচ্ছিন্ন এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র 'কোয়ান্টাম' দিয়ে গঠিত। যখন পূর্ববর্তী মহাবিশ্বের পদার্থের ঘনত্ব একটি নির্দিষ্ট সীমা বা 'প্ল্যাঙ্ক ঘনত্বে' (Planck density) পৌঁছায়, তখন কোয়ান্টাম প্রভাবগুলো একটি বিশাল বিকর্ষণ শক্তি তৈরি করে। এই বিকর্ষণ শক্তিই মহাবিশ্বের সংকোচনকে একটি বিস্ফোরক প্রসারণে রূপান্তর করে আজকের মহাবিশ্বের সূচনা করেছে।
এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি মহাবিশ্বের আদিম রহস্য নিয়ে আমাদের মৌলিক প্রশ্নটিকেই বদলে দিয়েছে। এখন প্রশ্নটি আর 'শুরুতে কী ছিল?' তা নয়, বরং 'পূর্ববর্তী মহাজাগতিক চক্রটি কেমন ছিল?'। এই তত্ত্ব মহাবিস্ফোরণকে কোনো জাদুকরী ঘটনা নয়, বরং প্রকৃতির মৌলিক নিয়মের একটি স্বাভাবিক ও অনিবার্য পরিণতি হিসেবে তুলে ধরে। এর ফলে আমরা একটি চিরস্থায়ী এবং স্পন্দমান মহাজাগতিক বাস্তবতাকে বোঝার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলাম।




