প্রত্নতাত্ত্বিকরা সাধারণত লুণ্ঠিত সমাধির সাথেই পরিচিত, যেখানে প্রাচীন ধন-সম্পদের কেবল ধ্বংসাবশেষই অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু ২০২৬ সালের জুন মাসে রোমের নিকটস্থ সান জুলিয়ানো মালভূমির পাদদেশে সম্পূর্ণ সিল করা দ্বিতীয় একটি ইট্রুস্কান সমাধিকক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়, যার প্রবেশপথ পাথর দিয়ে বন্ধ করার দীর্ঘ ২৬০০ বছর পর এই প্রথম খোলা হয়েছে। প্রথম অক্ষত সমাধিটি আবিষ্কৃত হওয়ার মাত্র এক বছর পর এই ঘটনাটি ঘটল, যা এই প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রটির বিশেষ গুরুত্ব ও সম্ভাবনার দিকটিকেই তুলে ধরে।
ইট্রুস্কানরা সরাসরি পাহাড় কেটে সমাধি তৈরি করত, যাদের সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু হয়ে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে পূর্ণতা লাভ করেছিল। বেইলর বিশ্ববিদ্যালয়ের এসজিএআরপি (সান জুলিয়ানো আর্কিওলজিক্যাল রিসার্চ প্রজেক্ট) প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সাল থেকে এই এলাকায় ৬০০-রও বেশি ইট্রুস্কান সমাধির নথিবদ্ধ করা হয়েছে। তবে ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত এগুলোর একটিও অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়নি—রোমান সাম্রাজ্যের পরবর্তী সময় থেকেই প্রতিটি সমাধি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল। অধ্যাপক ডেভিড জোরির নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি অবশেষে সেই পরিসংখ্যান বদলে দিয়েছে।
২০২৫ সালের ২৭ জুন আবিষ্কৃত প্রথম সিল করা সমাধিটিতে চারজনের দেহাবশেষ এবং শতাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু পাওয়া গিয়েছিল। কাইওলো এলাকায় মাত্র কয়েক মিটার দূরে খুঁজে পাওয়া দ্বিতীয় সমাধিটি আকারে ছোট হলেও বিজ্ঞানের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। সাউথ ইট্রুরিয়া আর্কিওলজিক্যাল সুপারিনটেনডেন্সের বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে, এর প্রবেশপথটি আদি পাথরের স্ল্যাব দিয়েই বন্ধ ছিল। পাথরের সেই ফলকটি কখনও সরানো হয়নি এবং সেখানে কোনো ধরনের ভাঙচুর বা ছিদ্রের চিহ্নও মেলেনি।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা ভেতরে প্রবেশ করে সেখানে দুজন ব্যক্তির মৃতদেহ দেখতে পান। একজনের পাশে একটি ধারালো বর্শা রাখা ছিল, যা সম্ভবত মৃত ব্যক্তির পুরুষ হওয়া অথবা উচ্চ সামাজিক মর্যাদার ইঙ্গিত দেয়। সমাধিতে পাওয়া অন্যান্য জিনিসের মধ্যে ছিল বড় মাটির পাত্র ‘ওল্লে’, পালিশ করা কালো রঙের ‘বুকেরো’ বাটি এবং তেল বা সুগন্ধি রাখার জন্য ব্যবহৃত একটি গ্রীক ‘আরিবালোস’। প্রতিটি প্রত্নবস্তু তার আদি অবস্থানেই ছিল, যা ইট্রুস্কান প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।
এই ধরণের আবিষ্কার কেবল সমাধি দেওয়ার রীতিনীতিই নয়, বরং ইট্রুস্কান সমাজের সামাজিক কাঠামো পুনর্গঠনেও সাহায্য করে। জিনিসপত্রের বিন্যাস, মাটির পাত্রের ধরণ এবং অস্ত্রের উপস্থিতি জীবিতদের সাথে মৃতদের আত্মিক সম্পর্কের জটিল বিশ্বাস এবং সমাধির মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির পদমর্যাদা প্রকাশের বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলে। একই স্থানে পাওয়া সময়ের ব্যবধানে তৈরি অথচ অক্ষত এই দুটি সমাধি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে শেষকৃত্যের বিবর্তন তুলনামূলক আলোচনার এক দুর্লভ সুযোগ করে দিয়েছে। উভয় কক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করবে যে, ইট্রুস্কান সংস্কৃতির ‘ওরিয়েন্টালাইজিং’ এবং ‘আর্কাইক’ পর্যায়ের সন্ধিক্ষণে তাদের বিশ্বাসগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল।
গবেষকরা এখন মানুষের দেহাবশেষ এবং প্রত্নবস্তুগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণের পরিকল্পনা করছেন। মৃতদের বয়স, লিঙ্গ, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং সমাধির উপকরণের বিন্যাস থেকে জানা যাবে ইট্রুস্কানরা মৃত্যুকে কীভাবে দেখত এবং তাদের বিশ্বভাবনায় পরকালের স্থান কোথায় ছিল। এটি ইতোমধ্যেই স্পষ্ট যে, বারবারানো রোমানো শহরের স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তা এবং নিয়মিত তদারকির ফলে এলাকাটি লুণ্ঠন থেকে সুরক্ষিত ছিল। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের শেষ পর্যন্ত কাইওলো এলাকায় খনন কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, কারণ এত অল্প পরিসরে দুটি অক্ষত সমাধি পাওয়া যাওয়ার অর্থ হলো আশেপাশে আরও এমন লুণ্ঠিত না হওয়া সমাধি থাকতে পারে।
এই আবিষ্কারটি প্রমাণ করে যে প্রত্নবস্তু সংরক্ষিত থাকা কতটা জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটি না থাকলে আমরা কেবল বস্তু নয়, বরং আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কিত ইতিহাসের এক বিশাল অংশ হারিয়ে ফেলি। হাজার বছর পরেও এই নিথর পাথরগুলো মানুষের সম্পর্ক, আচার-প্রথা এবং প্রয়াতদের প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলতে পারে—যদি আমরা তাদের ভাষা বুঝতে সক্ষম হই।
