কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্টোনহেঞ্জের রহস্যের নতুন দিক উন্মোচন করেছে: প্রাচীন পাথরগুলি কী লুকিয়ে রাখে

লেখক: Uliana S

ইংল্যান্ডের সলসবেরি সমতলে প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে স্টোনহেঞ্জ। প্রাগৈতিহাসিক ইউরোপের অন্যতম রহস্যময় এই স্থাপত্যটি নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে এর নিয়মতান্ত্রিক গবেষণা শুরু হলেও, গত কয়েক দশকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সামনে এসেছে। বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এই বিশাল কাঠামোর পেছনের রহস্য উন্মোচন করার চেষ্টা করছেন।

এই স্মৃতিস্তম্ভের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরনো এবং এটি বেশ কয়েকটি ধাপে নির্মিত হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের দিকে এখানে প্রথম মাটির বাঁধ ও পরিখা তৈরি করা হয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ওয়েলস থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এখানে নীল পাথর বা 'ব্লু স্টোন' আনা হয়েছিল। ২০২৬ সালে কার্টিন ইউনিভার্সিটির (Curtin University) গবেষকরা নদীর পলিতে থাকা খনিজ পদার্থের ভূ-রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে, এই পাথরগুলো কোনো হিমবাহের মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের সাহায্যেই এখানে আনা হয়েছিল। এটি নব্যপ্রস্তর যুগের মানুষের অসামান্য লজিস্টিক দক্ষতা ও সামাজিক সংগঠনের পরিচয় দেয়।

পরবর্তী সময়ে এখানে বিশাল সারসেন পাথরের ত্রয়ী বা ট্রিলিথন স্থাপন করা হয়। স্টোনহেঞ্জের নকশাটি মহাজাগতিক ঘটনার সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যুক্ত। গ্রীষ্মকালীন অয়নকালে (Summer Solstice) সূর্য ঠিক একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর ওপর দিয়ে উদিত হয়, যা কেন্দ্র থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। শুধু সূর্য নয়, চন্দ্রচক্রের প্রতিও তাদের গভীর মনোযোগ ছিল। বিশেষ করে ৫৬টি 'অউব্রে হোল' বা গর্ত সম্ভবত চাঁদের গতিবিধি দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো।

স্টোনহেঞ্জ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন স্থাপনা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বিশাল ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিক ভূখণ্ডের অংশ। এর চারপাশে ডারিংটন ওয়ালস-এর মতো শত শত সমাধি ঢিবি এবং মাটির বাঁধ ছড়িয়ে আছে। 'স্টোনহেঞ্জ হিডেন ল্যান্ডস্ক্যাপস প্রজেক্ট'-এর ভূ-তাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে হাজার হাজার অজানা বস্তু শনাক্ত করা হয়েছে। এর থেকে বোঝা যায় যে, শতাব্দী ধরে বিকশিত একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই স্টোনহেঞ্জ।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার, লিডার (LIDAR) স্ক্যানিং এবং থ্রিডি মডেলিংয়ের মাধ্যমে মাটির নিচের কাঠামো ধ্বংস না করেই পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তিগুলো ভূ-তাত্ত্বিক জরিপে প্যাটার্ন শনাক্ত করতে এবং প্রাচীন এই স্থাপত্যের শব্দতাত্ত্বিক বা জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যগুলো কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে বুঝতে সাহায্য করছে। এই সরঞ্জামগুলো বিজ্ঞানীদের এমন সব সূত্র খুঁজে পেতে সাহায্য করে যা প্রথাগত পদ্ধতিতে ধরা কঠিন ছিল।

স্টোনহেঞ্জের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে এখনো বিতর্ক থাকলেও এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কেউ এটিকে ধর্মীয় কেন্দ্র, কেউ সমাবেশের স্থান, আবার কেউ এটিকে প্রাচীন মানমন্দির হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এর নির্মাতারা জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা এবং সম্মিলিত শ্রম ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। এটি এমন এক জটিল সমাজের প্রতিফলন ঘটায় যারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে সক্ষম ছিল এবং যাদের কারিগরি জ্ঞান ছিল সমসাময়িক যুগের তুলনায় অনেক উন্নত।

আজও স্টোনহেঞ্জ গবেষকদের কাছে এক অন্তহীন অনুপ্রেরণার উৎস। মাঠপর্যায়ের কাজ, ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় কেবল নতুন তথ্যই দিচ্ছে না, বরং প্রাচীন মানুষের বিশ্বদর্শন এবং মহাবিশ্বে তাদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতেও সাহায্য করছে। যদিও অনেক রহস্য এখনো অমীমাংসিত, তবুও এই অজানাকে জানার আগ্রহই স্টোনহেঞ্জকে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পরিণত করেছে। ভবিষ্যতের গবেষণাগুলো সম্ভবত এই পাথুরে কাঠামোর আরও বিস্ময়কর দিক আমাদের সামনে তুলে ধরবে।

12 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।