একজন শিল্পী কী করেন যখন তার প্রিয় বন্ধু চিরবিদায় নেন? তিনি তাদের কাটানো সেরা মুহূর্তগুলো দিয়ে একটি শিল্পকর্ম তৈরি করেন। তাইওয়ানের একজন শিল্পী তার মৃত কুকুরের স্মরণে এক অপূর্ব ভাস্কর্য তৈরি করেছেন।

লেখক: Katerina S.

পনেরো বছর আগে তাইওয়ানি শিল্পী লিয়াং রেনচুয়ানের (Liang Renchuan) বাবার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে হঠাৎ একটি পথশিশু কুকুর উপস্থিত হয়েছিল। তাকে কেউ আমন্ত্রণ জানায়নি বা কেউ তার আশাও করেনি, কিন্তু সে এসেছিল এবং সেখানেই থেকে গিয়েছিল। এভাবেই এক মানুষ আর প্রাণীর মধ্যে বন্ধুত্বের এক মর্মস্পর্শী গল্পের সূচনা হয়।

কুকুরটির নাম রাখা হয়েছিল হাচিকো—বিখ্যাত সেই জাপানি কুকুরের নামানুসারে, যে ছিল বিশ্বস্ততার এক অনন্য প্রতীক। আর পরিবারের সদস্যরা তাকে ভালোবেসে 'সিয়াওবা' বলে ডাকতেন। পরবর্তী ১৪ বছর সে ছিল শিল্পীর ছায়াসঙ্গী এবং তাইওয়ানের সমুদ্র সৈকতে তার দীর্ঘ পথচলার চিরকালীন সাথী।

তাদের সেই ভ্রমণের সময় থেকেই এক বিশেষ প্রথার জন্ম হয়, যা পরে নিছক স্মৃতির চেয়েও মহৎ কিছুতে পরিণত হয়েছিল। লিয়াং রেনচুয়ান এবং হাচিকো একসাথে সমুদ্রতীরে ঘুরে বেড়াতেন এবং শিল্পী সেখান থেকে 'ড্রিফটউড' বা সমুদ্রের ঢেউ আর সময়ের ঘর্ষণে মসৃণ হওয়া কাঠের টুকরো সংগ্রহ করতেন। কুকুরটি তার পাশেই হাঁটত, ঢেউয়ের সাথে খেলত এবং মাঝেমধ্যে নিজেও ছোট লাঠির টুকরো কুড়িয়ে আনত। এই ভ্রমণগুলো তাদের প্রতিদিনের এক শান্ত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।

হাচিকো যখন বৃদ্ধ হতে শুরু করল, লিয়াং রেনচুয়ান বুঝতে পারলেন যে এই বাস্তব পৃথিবীতে তাদের একসাথে পথচলার সময় ফুরিয়ে আসছে। তখনই তিনি এক আবেগঘন শৈল্পিক সিদ্ধান্ত নিলেন—যেসব কাঠের টুকরো তারা একসাথে সংগ্রহ করেছিলেন, সেগুলো দিয়েই তিনি তার প্রিয় কুকুরের একটি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য তৈরির পরিকল্পনা করলেন।

হাচিকো যখন বেঁচে ছিল, তখনই এই কাজ শুরু হয়েছিল। শিল্পী সেই অনিবার্য বিচ্ছেদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি, বরং তিনি শিল্পের মাধ্যমে সবচেয়ে সততার সাথে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। ভাস্কর্যের প্রতিটি কাঠের টুকরো কেবল কোনো সাধারণ উপকরণ ছিল না। এটি ছিল একেকটি বিশেষ ভ্রমণ, কোনো একটি নির্দিষ্ট দিন বা বিশেষ কোনো মুহূর্তের সাক্ষী, যখন কুকুরটি তার পাশে হাঁটছিল আর তার মালিক বালু থেকে আরেকটি কাঠের টুকরো কুড়িয়ে নিচ্ছিলেন। ভাস্কর্যটি কেবল কুকুরের অবয়বই ফুটিয়ে তোলেনি, বরং তাদের একসাথে কাটানো জীবনের নির্যাসকে ধারণ করেছে।

হাচিকোর মৃত্যুর পর লিয়াং রেনচুয়ান তার কাজটি শেষ করেন। তিনি ভাস্কর্যটির গলায় কুকুরের আসল কলারটি পরিয়ে দেন—যেটি হাচিকো জীবদ্দশায় পরত। শিল্পী তার কুকুরকে 'ফিরিয়ে আনার' কোনো বৃথা চেষ্টা করেননি। তিনি কোনো কাল্পনিক সুন্দর প্রতিকৃতিও তৈরি করতে চাননি। বরং তিনি তাদের জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোর প্রতীক হিসেবে একসাথে জমানো সেই ড্রিফটউডের টুকরোগুলোকেই একটি ভাস্কর্যের রূপ দিয়েছেন।

এই শিল্পকর্মটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। এটি কেবল তার রূপ বদলায়: চঞ্চল ও পশমযুক্ত শরীর থেকে তা কাষ্ঠখণ্ড ও স্থির মূর্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা দৈনন্দিন স্মৃতি থেকে চিরন্তন এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে সর্বজনীন হয়ে ওঠে।

লিয়াং রেনচুয়ান এবং হাচিকোর কাহিনী কেবল হারানোর কোনো শোকাতুর গল্প নয়। এটি একটি গভীর উপলব্ধি যে শিল্প কীভাবে ভালোবাসার রূপ নিতে পারে এবং স্মৃতি কীভাবে উপস্থিতির এক অনন্য মাধ্যম হতে পারে। হাচিকোর এই ভাস্কর্যটি কেবল একটি কুকুরের স্মৃতিস্তম্ভ নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিল্পের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী সৃষ্টিগুলো কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেয়। আর মাঝেমধ্যে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমরা তিলে তিলে সংগ্রহ করি—নিঝুম সমুদ্রসৈকতে, প্রিয়জনের ঠিক পাশে থেকে।

5 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Dodo

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
একজন শিল্পী কী করেন যখন তার প্রিয় বন্ধু চ... | Gaya One