বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত কৃত্রিম ‘প্রিন্টেড নিউরন’ সরাসরি মস্তিষ্কের সাথে সংযোগ স্থাপনে সক্ষম: নিউরো ইন্টারফেসে নতুন দিগন্ত

লেখক: Tatyana Hurynovich

বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত কৃত্রিম ‘প্রিন্টেড নিউরন’ সরাসরি মস্তিষ্কের সাথে সংযোগ স্থাপনে সক্ষম: নিউরো ইন্টারফেসে নতুন দিগন্ত-1

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রকৌশলীরা এমন এক কৃত্রিম নিউরন তৈরি করেছেন, যা সফলভাবে জীবন্ত মস্তিষ্কের কোষের সাথে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। এই গবেষণার ফলাফল মর্যাদাপূর্ণ ‘নেচার ন্যানোটেকনোলজি’ (Nature Nanotechnology) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

কী তৈরি করা হয়েছে

নতুন এই ডিভাইসগুলো মূলত অ্যারোসল জেট প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে তৈরি এক ধরণের কৃত্রিম নিউরন। এই প্রযুক্তিতে নমনীয় পলিমার বেইজ বা ভিত্তির নির্দিষ্ট অংশে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ‘ইলেকট্রনিক কালি’—যা বৈদ্যুতিক সার্কিট তৈরির বিশেষ উপাদান—প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে ডিভাইসগুলো বেশ নরম হয় এবং জৈবিক টিস্যুর কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হয়ে ওঠে।

এই উদ্ভাবনের প্রধান বিশেষত্ব হলো মানুষের আসল নিউরনের মতো জটিল বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করার ক্ষমতা। সাধারণ কৃত্রিম বিকল্পগুলো যেখানে কেবল সরল পালস তৈরি করতে পারে, সেখানে এই নতুন নিউরনগুলো একক স্পাইক, ধারাবাহিক সিগন্যাল এবং বিরতিহীন প্যাটার্নের মতো বিভিন্ন ধরণের তরঙ্গ তৈরি করতে সক্ষম।

এটি যেভাবে কাজ করে

বিজ্ঞানীরা পলিমারের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে এখানে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। সাধারণত নিউরোমর্ফিক সিস্টেমে এই উপাদানটি সরিয়ে ফেলা হয় কারণ এটি বিদ্যুৎ প্রবাহে বাধা দেয়। তবে এক্ষেত্রে পলিমারটিকে আংশিকভাবে পচানো হয়েছে, যা বিদ্যুৎ প্রবাহের সময় অসমভাবে ক্ষয় হতে থাকে। এর ফলে একটি সরু পরিবাহী পথ তৈরি হয়, যা হুবহু আসল নিউরনের মতো তীব্র বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

কার্যকারিতার প্রমাণ

জীবন্ত টিস্যুর সাথে এই কৃত্রিম নিউরনের কার্যকারিতা যাচাই করতে গবেষকরা ইঁদুরের সেরিবেলামের স্লাইস ব্যবহার করে পরীক্ষা চালিয়েছেন। কৃত্রিম নিউরন থেকে নির্গত বৈদ্যুতিক সংকেতগুলো আসল নিউরনে সরাসরি সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে—যা কেবল সময়ের দিক থেকেই নয়, বরং পালসের আকৃতির দিক থেকেও হুবহু মিলে গেছে। এর অর্থ হলো, এই ডিভাইসগুলো সত্যিই নিউরাল সার্কিটে সক্রিয়তা শুরু করতে পারে।

প্রযুক্তির সুবিধা

এই প্রিন্টেড নিউরনগুলো অত্যন্ত সাশ্রয়ীভাবে শক্তি ব্যবহার করে। সিগন্যালের বৈচিত্র্যের কারণে একটি নিউরন বর্তমান কম্পিউটিং সিস্টেমের সাধারণ কৃত্রিম নিউরনের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য কোড করতে পারে। ফলে বিশালাকার কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন পড়ে এমন লেটেস্ট এআই (AI) মডেলগুলোর তুলনায় এতে অনেক কম উপাদান ও শক্তি খরচ হয়।

প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বর্জ্যের পরিমাণও কমে আসে, কারণ প্রয়োজনীয় উপাদান কেবল নির্দিষ্ট স্থানেই ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এই ডিভাইসগুলো তৈরি করা তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং সহজ।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

গবেষণার লেখকরা মনে করেন যে, এই প্রিন্টেড নিউরনগুলো নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলোর ভিত্তি হতে পারে:

  • নতুন নিউরো-ইন্টারফেস তৈরির ক্ষেত্রে;
  • শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি বা চলন ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য নিউরো-প্রোস্থেসিস তৈরিতে;
  • মানুষের মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতির কাছাকাছি এমন কম্পিউটিং সিস্টেম গঠনে।

নিউরনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে সক্ষম এই প্রযুক্তিগুলো জীবন্ত টিস্যু এবং ইলেকট্রনিক সিস্টেমের মধ্যকার দূরত্ব আরও কমিয়ে আনবে। এর ফলে ডিভাইসগুলো শরীরের বাইরের কোনো যন্ত্র না হয়ে বরং স্নায়ুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করবে। এটি স্নায়বিক রোগের চিকিৎসা এবং শারীরিক কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারের পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনবে।

নতুন নিউরনগুলো একক উপাদানের স্তরেই অনেক বেশি তথ্য কোড করতে পারায় সিস্টেমে প্রয়োজনীয় মোট যন্ত্রাংশের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। এটি আরও ছোট এবং সস্তা ডিভাইস তৈরির পথ প্রশস্ত করছে। যদি এই প্রযুক্তিটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তবে জটিল গণনা বা কম্পিউটেশন ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং চিকিৎসাক্ষেত্রের জন্য আরও সহজলভ্য হয়ে উঠবে। এর ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রেক্ষাপট: কেন এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য দিন দিন বিপুল শক্তির প্রয়োজন হচ্ছে: মডেল এবং ডেটার ক্রমাগত বৃদ্ধি ডেটা সেন্টার, তাদের কুলিং সিস্টেম এবং বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং একটি পরিবেশগত সমস্যা হয়েও দাঁড়াচ্ছে।

প্রথাগত ইলেকট্রনিক্সে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা বাড়িয়ে বা চিপের আর্কিটেকচার উন্নত করে শক্তি সাশ্রয়ের চেষ্টা করা হয়, তবে এই পদ্ধতিটি ধীরে ধীরে তার শারীরিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে। বিজ্ঞানীরা এখন বিকল্প হিসেবে মানুষের মস্তিষ্ক থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজছেন—যা অত্যন্ত কম শক্তি ব্যয় করে জটিল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে সক্ষম বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘কম্পিউটিং ডিভাইস’। ইলেকট্রনিক্সে মস্তিষ্কের এই কার্যনীতি অনুসরণের প্রচেষ্টাকেই ‘নিউরোমর্ফিক কম্পিউটিং’ বলা হয়।

এই ধরণের পদ্ধতিগুলো ইতিমধ্যে গবেষণাগারের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরে আসতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে টেক্সাসে একটি কেন্দ্র খোলা হয়েছে যেখানে নিউরনের কার্যকারিতা অনুকরণকারী সিস্টেমগুলো কম্পিউটেশনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

জৈব-প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স এবং নিউরোসায়েন্সের এই মেলবন্ধন নিউরো-ইন্টারফেস এবং পরবর্তী প্রজন্মের সাশ্রয়ী কম্পিউটিংয়ের বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

11 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।