আমরা সাধারণত মহাকাশকে স্থবির বলেই মনে করি। কিন্তু টাউ ০৪২০২১ এবং ওফ ১৬৩১৩১ নক্ষত্রমণ্ডলের ওপর জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ এর উল্টোটিই প্রমাণ করে। আমাদের সামনে এখন যা আছে তা কেবল কিছু সুন্দর ছবি নয়, বরং এটি আমাদের নিজেদের অতীতের এক রাসায়নিক মানচিত্র।
টেলিস্কোপটি আসলে ঠিক কী দেখেছে? তরুণ নক্ষত্রদের চারপাশে গ্যাস এবং ধুলোর দানবীয় চাকতি বা প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিস্কগুলোতে কিছু স্পষ্ট কালো বলয় দেখা গেছে। এগুলো কিন্তু শূন্যস্থান নয়। এগুলো মূলত ক্রমবর্ধমান ভ্রূণ-গ্রহগুলোর তৈরি করা চলার পথ। নিজেদের ভবিষ্যৎ ভূত্বক এবং বায়ুমণ্ডলের রসদ জোগাতে এগুলো অনেকটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো মহাজাগতিক ধূলিকণা শুষে নেয়।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে এই গবেষণার প্রধান সাফল্য গ্রহের অস্তিত্বের প্রমাণ নয়, বরং সেগুলো কী দিয়ে তৈরি হচ্ছে তা শনাক্ত করা। এমআইআরআই (MIRI) স্পেকট্রোমিটারের সাহায্যে গবেষকরা ওই অঞ্চলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বেনজিন এবং অন্যান্য জটিল হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি লক্ষ করেছেন।
পৃথিবীতে পানি এবং জৈব উপাদান কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে কি কখনো ভেবেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত লুকিয়ে আছে মহাকাশের এমন 'ধূলিময়' অঞ্চলগুলোতেই। 'ওয়েব' টেলিস্কোপ দেখিয়েছে যে তুষাররেখা (যে সীমার বাইরে পানি এবং মিথেন জমে বরফ হয়ে যায়) আগের ধারণার চেয়েও নক্ষত্রের অনেক বেশি কাছে অবস্থিত। এটি প্রাণের অনুকূল বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ধুলোর আস্তরণের ভেতরে কোনো 'নবজাতক' গ্রহকে সরাসরি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। এটি ধুলোর এক ঘন আস্তরণের ভেতরে লুকিয়ে থাকে, যা তাপ পুনরুৎসরিত করে। আমরা গ্রহটিকে সরাসরি দেখি না, বরং তার তাপীয় রেখা এবং তার কারণে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় আলোড়ন পর্যবেক্ষণ করি। এটি অনেকটা কুয়াশার মধ্যে নৌকাটিকে না দেখে সেটির চলার ফলে সৃষ্ট ঢেউ দেখে নৌকাটির অস্তিত্ব বোঝার মতো।
এই পর্যবেক্ষণগুলো জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান নির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা নিউরাল নেটওয়ার্কগুলোকে প্রশিক্ষিত করার ক্ষেত্রে এক বড় পদক্ষেপ। এখন এআই (AI) তাত্ত্বিক অনুমানের পরিবর্তে ধুলোর ঘনত্বের প্রকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গ্রহমণ্ডলীর বিবর্তন নিয়ে কাজ করতে পারবে। ভবিষ্যতে এটি আমাদের পৃথিবীর মতো গ্রহগুলোর অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সাহায্য করবে, এমনকি সেগুলো সরাসরি দেখার প্রযুক্তি উদ্ভাবনের আগেই।


