২০২৬ সালের ১৭ জুন, বুধবার ছিল ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের একটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর দিন। এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা ফুটবল প্রেমীদের জন্য ছিল এক বিশাল উৎসব। গ্রুপ আই থেকে শুরু করে গ্রুপ এল পর্যন্ত বিভিন্ন দলের লড়াইয়ে মাঠের উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। প্রতিটি ম্যাচেই খেলোয়াড়রা তাদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা দর্শকদের জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
দিনের প্রথম ম্যাচে রাত ১টায় গ্রুপ আই-এর লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল ইরাক এবং নরওয়ে। এই ম্যাচে নরওয়ে তাদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়ে ইরাককে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে। ইউরোপীয় এই শক্তির সামনে ইরাকি রক্ষণভাগ খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ম্যাচের শুরু থেকেই নরওয়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে এবং একের পর এক গোল করে জয় নিশ্চিত করে।
নরওয়ের এই বিশাল জয়ের প্রধান কারিগর ছিলেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড আর্লিং হালান্দ। তিনি এই ম্যাচে দুর্দান্ত এক জোড়া গোল করে নিজের জাত চিনিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি টুর্নামেন্টের অন্যতম শীর্ষ গোলদাতা হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করলেন। হালান্দের এই বিধ্বংসী ফর্ম নরওয়েকে টুর্নামেন্টে অনেক দূর নিয়ে যাবে বলে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ভোর ৪টায় গ্রুপ জে-র ম্যাচে আলজেরিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আলবিসেলেস্তেরা ৩-০ গোলের এক সহজ ও দাপুটে জয় তুলে নেয়। পুরো ম্যাচেই আর্জেন্টিনার আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। আলজেরিয়া রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলার চেষ্টা করলেও আর্জেন্টিনার পরিকল্পিত আক্রমণভাগের সামনে তারা বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। এই জয়ের ফলে আর্জেন্টিনা তাদের গ্রুপে শীর্ষস্থান মজবুত করল।
এই ম্যাচটি ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে লিওনেল মেসির অসাধারণ হ্যাটট্রিকের কারণে। তিনি এই ম্যাচে তিনটি গোল করেন, যা তাকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে মোট ১৬টি গোলের মালিক করে তোলে। এর মাধ্যমে তিনি জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোজের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসালেন। মেসির এই অনন্য অর্জন ফুটবল বিশ্বে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং তার শ্রেষ্ঠত্বকে আবারও প্রমাণ করেছে।
সকাল ৭টায় গ্রুপ জে-র অন্য একটি ম্যাচে অস্ট্রিয়া এবং জর্ডান একে অপরের মোকাবিলা করে। সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে অস্ট্রিয়া ৩-১ ব্যবধানে জয়লাভ করে। ইউরোপীয় এই দলটি শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল এবং পরিকল্পিত আক্রমণের মাধ্যমে জর্ডানের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখেছিল। জর্ডান লড়াই করার চেষ্টা করলেও অস্ট্রিয়ার অভিজ্ঞতার কাছে তারা শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হয়।
সান ফ্রান্সিসকোর মাঠে অস্ট্রিয়ার এই জয় তাদের নকআউট পর্বের পথে অনেকটা এগিয়ে দিল। জর্ডান একটি গোল শোধ করে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দিলেও অস্ট্রিয়ার সুসংগঠিত খেলার সামনে তারা আর কোনো বড় সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। এই জয়টি অস্ট্রিয়ার জন্য গ্রুপ পর্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দেবে।
রাত ১০টায় গ্রুপ কে-র ম্যাচে পর্তুগাল এবং ডিআর কঙ্গোর মধ্যে এক নাটকীয় লড়াই দেখা যায়। ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামলেও পর্তুগালকে ১-১ গোলে রুখে দেয় কঙ্গোর লড়াকু ফুটবলাররা। এটি ছিল দিনের অন্যতম বড় চমক, কারণ পর্তুগালের মতো তারকাখচিত দলের বিরুদ্ধে কঙ্গো অসাধারণ রক্ষণাত্মক কৌশল এবং পাল্টা আক্রমণ প্রদর্শন করেছে।
গ্রুপ কে-র এই ম্যাচটি ছিল অপ্রত্যাশিতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। পর্তুগালের আক্রমণভাগ কঙ্গোর রক্ষণব্যুহ ভাঙতে বারবার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি। এই ড্রয়ের ফলে গ্রুপ কে-র পয়েন্ট টেবিলের সমীকরণ এখন বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্তুগালের মতো বড় দলের জন্য এই পয়েন্ট হারানো পরবর্তী রাউন্ডের লড়াইকে কিছুটা কঠিন করে তুলতে পারে।
রাত ১১টায় গ্রুপ এল-এর হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড এবং ক্রোয়েশিয়া। ডালাসে অনুষ্ঠিত এই গোলবহুল ম্যাচে ইংল্যান্ড ৪-২ ব্যবধানে জয়ী হয়। দুই দলের আক্রমণাত্মক ফুটবলে দর্শকরা একটি অত্যন্ত উপভোগ্য ম্যাচ উপহার পেয়েছেন। ইংল্যান্ডের ফরোয়ার্ডরা এই ম্যাচে তাদের গতির প্রদর্শন করেছেন এবং ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগকে বারবার পরাস্ত করেছেন।
ক্রোয়েশিয়া এই ম্যাচে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের সেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুনরাবৃত্তি করতে চেয়েছিল, কিন্তু ইংল্যান্ডের শক্তিশালী আক্রমণভাগের সামনে তারা সফল হতে পারেনি। ডালাসের মাঠে ইংল্যান্ডের এই জয় তাদের গ্রুপ এল-এর শীর্ষে থাকার লড়াইয়ে অনেকটা এগিয়ে দিল। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার জন্য এই হার টুর্নামেন্টে টিকে থাকার লড়াইকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলল।
দিনের শেষ ম্যাচে রাত ২টায় ঘানা এবং পানামা একে অপরের মুখোমুখি হয়। টরন্টোতে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে ঘানা ১-০ গোলের একটি কষ্টার্জিত জয় পায়। পুরো ম্যাচে দুই দলের মধ্যেই সমানে সমান লড়াই চললেও একটি মাত্র গোল ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। ঘানার রক্ষণভাগ পুরো ম্যাচে পানামার আক্রমণগুলোকে সফলভাবে প্রতিহত করে তাদের জয় নিশ্চিত করেছে।
টরন্টোর এই জয়টি ঘানার জন্য অত্যন্ত স্বস্তির ছিল। একমাত্র গোলের ব্যবধানে জয় পেলেও এটি তাদের পূর্ণ তিন পয়েন্ট এনে দিয়েছে। পানামা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমতায় ফেরার চেষ্টা করলেও ফিনিশিংয়ের অভাবে তারা গোল করতে ব্যর্থ হয়। এই জয়ের মাধ্যমে ঘানা গ্রুপ এল-এ নিজেদের অবস্থান শক্ত করল এবং টুর্নামেন্টে টিকে থাকার আশা জিইয়ে রাখল।
সামগ্রিকভাবে ১৭ জুনের এই দিনটি ছিল বড় দলগুলোর আধিপত্য এবং ব্যক্তিগত অর্জনের এক অনন্য সংমিশ্রণ। একদিকে যেমন মেসি এবং হালান্দের মতো তারকারা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন, অন্যদিকে কঙ্গোর মতো দলগুলো বড় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে পয়েন্ট কেড়ে নিয়েছে। বিশ্বকাপের এই রোমাঞ্চকর যাত্রা ফুটবল ভক্তদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, কেন এই টুর্নামেন্টকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর বলা হয়।
- নরওয়ে ৪-১ ব্যবধানে ইরাককে হারিয়েছে, যেখানে হালান্দ জোড়া গোল করেছেন।
- আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে আলজেরিয়াকে পরাজিত করেছে এবং মেসি ১৬ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।
- অস্ট্রিয়া ৩-১ গোলে জর্ডানকে হারিয়ে সান ফ্রান্সিসকোতে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছে।
- পর্তুগাল এবং ডিআর কঙ্গোর ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়ে চমক সৃষ্টি করেছে।
- ইংল্যান্ড ৪-২ গোলে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে ডালাসে এক স্মরণীয় জয় পেয়েছে।
- ঘানা ১-০ গোলে পানামাকে হারিয়ে টরন্টোতে পূর্ণ পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে।




