শিল্পকলা জগতে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে মুম্বাইয়ের স্যাফরনআর্ট (Saffronart) বসন্তকালীন নিলামে রাজা রবি বর্মার অমর সৃষ্টি ‘যশোদা ও কৃষ্ণ’ (১৮৯০-এর দশক) ১৬৭.২ কোটি রুপিতে (প্রায় ১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিক্রি হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে, যখন নিলাম কক্ষে হাততালির শব্দে এই রেকর্ড ভাঙা দাম নিশ্চিত করা হয়। এটি কেবল একটি সাধারণ বিক্রয় নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় শিল্পের শ্রেষ্ঠত্বের এক জোরালো স্বীকৃতি। এই বিক্রয়ের মাধ্যমে ভারতীয় শিল্পকলা বিশ্বমানের মাস্টারপিসগুলোর মধ্যে তার যোগ্য স্থানটি দখল করে নিয়েছে।
এই চিত্রকর্মটি ২০২৫ সালে ক্রিস্টিজ নিলামে এম. এফ. হুসেনের একটি কাজের মাধ্যমে গড়া ১১৮ কোটি রুপির (১৩.৮ মিলিয়ন ডলার) আগের রেকর্ডটিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে। ‘যশোদা ও কৃষ্ণ’-এর চূড়ান্ত মূল্য ছিল এর প্রাক-নিলাম অনুমিত দাম ৮০-১২০ কোটি রুপির (৮.৬-১২.৯ মিলিয়ন ডলার) দ্বিগুণেরও বেশি। শিল্প বাজারের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের কাছেও এই অভাবনীয় মূল্যবৃদ্ধি ছিল একটি বড় চমক, যা প্রমাণ করে যে ধ্রুপদী শিল্পের চাহিদা বর্তমানে কতটা তুঙ্গে।
এই অমূল্য শিল্পকর্মটির ক্রেতা হলেন ভারতের প্রখ্যাত শিল্পপতি এবং সমাজসেবী ডক্টর সাইরাস এস. পুনাওয়ালা, যিনি সিরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা। নিলাম শেষে তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে ঘোষণা করেছেন যে, এই চিত্রকর্মটি ভারতেই থাকবে এবং সাধারণ মানুষের দেখার জন্য পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করা হবে। তাঁর এই পদক্ষেপটি দেশের শিল্পানুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
যেহেতু এই ক্যানভাসটি 'অ্যান্টিকুইটিস অ্যান্ড আর্ট ট্রেজারস অ্যাক্ট, ১৯৭২' অনুযায়ী 'জাতীয় শিল্প সম্পদ' (National Art Treasure) হিসেবে স্বীকৃত, তাই আইনত এটি দেশের বাইরে রপ্তানি করা অসম্ভব। এই কঠোর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে যে, রাজা রবি বর্মার এই মাস্টারপিসটি ভারতীয় জনসাধারণের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশেই সংরক্ষিত থাকবে এবং এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে।
১৮৯০-এর দশকে রাজা রবি বর্মার সৃজনশীলতার তুঙ্গে থাকাকালীন ‘যশোদা ও কৃষ্ণ’ চিত্রিত হয়েছিল। এই চিত্রকর্মে হিন্দু পুরাণের একটি অত্যন্ত আবেগঘন এবং পরিচিত মুহূর্ত ফুটে উঠেছে, যেখানে বালক কৃষ্ণ তাঁর পালক মাতা যশোদার কাছে কিছু আবদার করছেন, যখন যশোদা গরু দোয়ানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন। শিল্পীর নিপুণ তুলিতে মা ও সন্তানের এই শাশ্বত সম্পর্কটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
বাস্তববাদী শৈলীতে নির্মিত এই কাজটিতে আলো-ছায়ার (chiaroscuro) নিপুণ ব্যবহার দেখা যায়। চিত্রকর্মটি মূলত তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ হিসেবে বিবেচিত হয়:
- ইউরোপীয় একাডেমিক তৈলচিত্রের উন্নত কৌশল;
- ভারতীয় পৌরাণিক ও ধ্রুপদী বিষয়বস্তু;
- গল্প বলার অসাধারণ গভীরতা এবং আবেগীয় আবেদন।
রাজা রবি বর্মা (১৮৪৮-১৯০৬) ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং পথপ্রদর্শক ব্যক্তিত্ব। তাঁর অবদানের মাধ্যমেই ভারতীয় চিত্রকলা এক আধুনিক রূপ লাভ করেছিল। তাঁর প্রধান কৃতিত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ইউরোপীয় রীতির সাথে ভারতীয় পুরাণ ও নন্দনতত্ত্বের সার্থক মেলবন্ধন;
- লিথোগ্রাফির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে ধ্রুপদী কাহিনী ও দেবদেবীর ছবি পৌঁছে দেওয়া;
- উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুতে জাতীয় সাংস্কৃতিক জাগরণে বিশেষ ভূমিকা;
- ভারতীয় শিল্পের একটি স্বতন্ত্র এবং সর্বজনীন চাক্ষুষ ভাষা তৈরি করা।
‘যশোদা ও কৃষ্ণ’-এর এই রেকর্ড বিক্রয় ভারতীয় শিল্প বাজারের পরিপক্কতা এবং উনিশ শতকের ভারতীয় শিল্পের প্রতি বিশ্বব্যাপী সংগ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে প্রতিফলিত করে। এই নিলামের সাফল্য ধ্রুপদী ভারতীয় চিত্রকলার বিনিয়োগ মূল্য যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি দক্ষিণ এশীয় শিল্পকলা ক্ষেত্রে স্যাফরনআর্টের মতো নিলাম সংস্থাগুলোর প্রভাবকেও বিশ্বমঞ্চে সুসংহত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে ভারতীয় শিল্পীরা এখন আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন।
স্যাফরনআর্টের প্রেসিডেন্ট এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা মিনাল ওয়াজিরানি এই ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, মহান শিল্পকলা সর্বদা তার চিরন্তন মূল্য এবং প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করতে জানে। তাঁর মতে, এই বিক্রয়টি কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়, বরং এটি ভারতীয় সংস্কৃতির এক বিশাল জয়।
মিনাল ওয়াজিরানি আরও বলেন, "রাজা রবি বর্মার কাজের এই রেকর্ড বিক্রয় কেবল শিল্প বাজারের শক্তিকেই তুলে ধরে না, বরং ভারতীয় শিল্পের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে। এটি কেবল বাজারের জন্য একটি মাইলফলক নয়, বরং ভারতীয় শিল্পের স্থায়ী সাংস্কৃতিক এবং আবেগীয় প্রতিধ্বনির একটি শক্তিশালী স্মারক।" এই বিক্রয়ের মাধ্যমে রাজা রবি বর্মার শিল্পকর্মের বিশ্বজনীন আবেদন আবারও নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হলো।



