জলবায়ু পরিবর্তনকে সাধারণত কেবল ক্ষতির গল্প হিসেবেই দেখা হয়। হিমবাহ গলে যাওয়া, সামুদ্রিক বরফ কমে আসা এবং পরিচিত বাস্তুসংস্থানের পরিবর্তন অনেক দিন ধরেই দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্কটিকের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দলের নতুন গবেষণা এই প্রক্রিয়ার এক অভাবনীয় দিক উন্মোচন করেছে।
'নেচার' সাময়িকীতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে আর্কটিক অঞ্চলে হিমশৈলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এদের মধ্যে অনেকগুলো উত্তর-পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের হিমবাহ থেকে তৈরি হয়ে গ্রিনল্যান্ড এবং স্যালবার্ডের মধ্যবর্তী ফ্রাম প্রণালী দিয়ে ভেসে চলে।
এই হিমশৈলগুলোর বিশেষত্ব হলো, এরা বরফের সাথে প্রচুর পরিমাণে পাথর, নুড়ি এবং পলি বহন করে নিয়ে যায়। বরফ গলে যাওয়ার সাথে সাথে এগুলো মুক্ত হয়ে যায় এবং সমুদ্রের প্রায় ২৫০০ মিটার গভীরতায় নরম তলদেশের ওপর পাথরগুলো জমা হতে থাকে।
গভীর সমুদ্রের জগতের জন্য এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আর্কটিক মহাসাগরের তলদেশের বেশিরভাগ অংশই নরম পলিতে ঢাকা। তবে স্পঞ্জ, প্রবাল, সি-অ্যানিমোন এবং আরও অনেক প্রাণীর টিকে থাকা ও বেড়ে ওঠার জন্য শক্ত কোনো অবলম্বনের প্রয়োজন। হিমশৈল থেকে ঝরে পড়া এই পাথরগুলো মহাসাগরের বিশাল সমতল এলাকায় জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপে পরিণত হয়। সময়ের সাথে সাথে এগুলোর চারপাশে নতুন সব প্রাণিকুল গড়ে ওঠে এবং গভীর সমুদ্রের বাস্তুসংস্থানের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়।
বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলছেন যে, এর অর্থ জলবায়ুর ঝুঁকি কমে যাওয়া নয়। বরং হিমবাহের দ্রুত ধ্বংসই হিমশৈলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ। তবে এই গবেষণাটি দেখিয়ে দেয় যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া কতটা জটিল হতে পারে। পরিবেশের এক অংশের পরিবর্তন সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো স্থানে অভাবনীয় সব ঘটনার সূত্রপাত করতে সক্ষম।
আর্কটিক আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বিশাল পরিবর্তনের মধ্যেও জীবনের নতুন পথ খুঁজে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। যেখানে বরফ গলে হারিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেখানেই গভীর তলদেশে প্রাণের জন্য নতুন চারণভূমি তৈরি হচ্ছে।
এই ঘটনাটি পৃথিবীর স্পন্দনে নতুন কী যোগ করল?
প্রকৃতি কেবল ধ্বংসের ভাষায় কথা বলে না, বরং রূপান্তরের ভাষাও জানে। আর্কটিক হিমশৈলের এই ইতিহাস প্রমাণ করে যে, বড় ধরনের পরিবর্তনের যুগেও জীবন তার নতুন ভিত্তি খুঁজে চলে। সমুদ্রের তলদেশে ঝরে পড়া পাথরের মতোই প্রতিটি প্রক্রিয়া এক বিশাল ঐকতানের অংশ হয়ে ওঠে, যেখানে সবকিছুই একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত।



