ডলারের প্রচলিত চ্যানেলগুলো যখন নিষেধাজ্ঞার কারণে রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন অর্থ লেনদেনের জন্য বিকল্প পথের প্রয়োজন পড়ে—আর চীন সক্রিয়ভাবে সেই পথই তৈরি করছে। ২০২৬ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে, ডিজিটাল ইউয়ান অপারেশনাল সেন্টার বিদেশি ব্যাংকসহ ২৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে ই-সিএনওয়াই (e-CNY)-তে ২৪ ঘণ্টা আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের জন্য তারা সিবিইটিএস (CBETS) প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পারবে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নয়, বরং সুইফট (SWIFT) এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলের অংশ।
ব্লকচেইন প্রযুক্তির সমন্বয়ে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মটি বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সরাসরি চীনের আর্থিক ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করার সুযোগ দেয়। এর ফলে অংশগ্রহণকারীরা স্বল্প খরচে এবং দ্রুততম সময়ে অর্থ লেনদেনের সুবিধা পায়, যা প্রথাগত পদ্ধতিতে নজরদারি করা বেশ কঠিন। রয়টার্সের তথ্যমতে, এর মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারে ইউয়ানের ব্যবহার ত্বরান্বিত করা এবং বিদ্যমান বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ) উল্লেখ করেছে যে, এই ধরনের অবকাঠামো ইতিমধ্যে ইরান এবং রাশিয়াকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করছে; ফলে চীনের সাথে তেলের লেনদেন এখন ডলারের পরিবর্তে ক্রমবর্ধমানভাবে ইউয়ানে সম্পন্ন হচ্ছে। বেইজিংয়ের জন্য এটি বাণিজ্যে তাদের মুদ্রার অবস্থানকে শক্তিশালী করার একটি মাধ্যম, বিশেষ করে এশিয়ায় এবং 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' প্রকল্পের অংশীদারদের সাথে। চুক্তিবদ্ধ বিদেশি ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের আরও উন্নত সেবা প্রদানের সুযোগ দেখলেও, এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে চীনা ব্যবস্থার প্রভাবই আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাধারণ মানুষ বা বিদেশে ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোর জন্য এর অর্থ হলো সাশ্রয়ী লেনদেনের নতুন পথ উন্মোচন, যদিও এতে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা আরও খণ্ডিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পানির মতো অর্থও সেদিকেই প্রবাহিত হয় যেখানে বাধা কম, আর ডিজিটাল ইউয়ান এখন সেই রকমই একটি প্রবাহপথ হয়ে উঠছে। তবে এই নতুন পথগুলো কোনো নির্দিষ্ট একটি পক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়।
ঐতিহাসিকভাবে, একটি মুদ্রার আন্তর্জাতিকীকরণের জন্য আস্থা ও নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হয়; যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির জোরে ডলার তার আধিপত্য বিস্তার করেছিল। চীন এখানে প্রযুক্তিগত সুবিধা—গতি এবং সার্বক্ষণিক সেবা—প্রদান করছে, যদিও ডলারের মতো রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে এর গভীরতা এখনো ততটা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, লেনদেনের পরিমাণ বর্তমানে খুব বেশি না হলেও, প্ল্যাটফর্মে প্রতিটি নতুন সদস্যের অন্তর্ভুক্তি ইউয়ানের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিশেষে, সিবিইটিএস (CBETS) এবং এই ধরণের উদ্যোগগুলো কেবল সামষ্টিক অর্থনীতিকেই বদলে দিচ্ছে না, বরং দৈনন্দিন সিদ্ধান্তগুলোকেও প্রভাবিত করছে: যেমন কোথায় টাকা পাঠানো হবে, কোন মুদ্রায় সঞ্চয় রাখা হবে কিংবা এশীয় অংশীদারদের সাথে লেনদেন কীভাবে সম্পন্ন হবে। অর্থ সর্বদা সুবিধা এবং নিরাপত্তার মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে।

