গ্রীষ্মকালীন ছুটির জন্য ইউরোপ অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে থাকলেও, এ বছর স্থানীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষগুলো সৈকতে ধূমপান ও উচ্চস্বরে গান বাজানো থেকে শুরু করে সমুদ্রে মলমূত্র ত্যাগ করা এবং বিকিনি পরে রাস্তায় হাঁটার ওপর নানা নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করছে। স্থানীয় আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা আর কোনো ছাড় পাওয়ার উপায় নয়। আপনার ছুটি যেন শ্রীঘরে শেষ না হয়, সে জন্য ইউরোপের সৈকতগুলোর সবচেয়ে কঠিন এবং অদ্ভুত কিছু নিয়মের নির্দেশিকা এখানে তুলে ধরা হলো।
১. সমুদ্রে 'শারীরিক বর্জ্য ত্যাগ' নিষিদ্ধ
পানি বা বালিতে মলমূত্র ত্যাগ করা কোনো মামুলি ব্যাপার নয়, যেমনটি অনেকে ভেবে থাকেন। স্পেনে এই কাজের জন্য বেশ বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে:
- ভিগো (গ্যালিসিয়া): ২০২২ সালেই কর্তৃপক্ষ সমুদ্রের তীরে বা পানিতে 'শারীরিক বর্জ্য নিষ্কাশন'-এর জন্য ৭৫০ ইউরো জরিমানার নিয়ম চালু করেছে।
- মারবেলা (আন্দালুসিয়া): ২০২৪ সাল থেকে মালাগা পৌরসভার অন্তর্গত ২৫টি সৈকতের পানির নিচে প্রস্রাব করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
২. উচ্চস্বরে গান বাজানো নিষিদ্ধ (এবং স্পিকার বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে)
সমুদ্রতীরে গান শুনতে যারা পছন্দ করেন, তাদের বিশেষ করে পর্তুগালে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। ২০২৩ সাল থেকে দেশটির ন্যাশনাল মেরিটাইম অথরিটি (AMN) স্থানীয় বাসিন্দা এবং অন্যান্য পর্যটকদের শান্তি বজায় রাখতে উচ্চশব্দে পোর্টেবল স্পিকার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।
- ব্যক্তিগতভাবে এই নিয়ম ভাঙলে ২০০ থেকে ৪,০০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
- কোনো সংগঠিত দলের ক্ষেত্রে এই জরিমানার পরিমাণ ৩৬,০০০ ইউরো (২,০০০ থেকে ৩৬,০০০ ইউরো) পর্যন্ত হতে পারে।
- এছাড়া, নিয়ম লঙ্ঘনকারীর অডিও সরঞ্জাম পুরোপুরি বাজেয়াপ্ত করার পূর্ণ অধিকার কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
৩. সাঁতারের পোশাক কেবল সৈকতের জন্য
ইউরোপের অনেক উপকূলীয় শহরে বালুকাময় এলাকার বাইরে পোশাকের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম বা ড্রেস কোড কার্যকর রয়েছে। সৈকতের পোশাক পরে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করাটা আপনার পকেটের ওপর বেশ চাপ ফেলতে পারে:
- সরেন্টো (ইতালি): শহরে বিকিনি বা সাঁতারের পোশাক পরে ঘুরলে ৫০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
- আলবুফেইরা (পর্তুগাল): নির্দিষ্ট সৈকত এলাকা, হোটেল বা পুলের বাইরে সাঁতারের পোশাক পরে থাকলে ৩০০ থেকে ১,৫০০ ইউরো জরিমানা গুনতে হতে পারে।
- বার্সেলোনা এবং ম্যালোর্কা (স্পেন): এখানে সৈকতের পোশাক পরে বা টপলেস হয়ে দোকান ও রেস্তোরাঁয় ঢোকা নিষিদ্ধ; অমান্য করলে ৩০০ ইউরো জরিমানা দিতে হবে।
৪. বালিতে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ: ধূমপান নিষিদ্ধ
পরিবেশবান্ধব অবকাশ যাপন এখন নতুন ধারা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর তাই জনস্বাস্থ্য ও সমুদ্রের পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় সৈকতে ধূমপান ক্রমেই নিষিদ্ধ হচ্ছে:
- স্পেন: বার্সেলোনা, সান সেবাস্তিয়ান এবং বালিয়ারিক ও ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জসহ ৬০০টিরও বেশি সৈকতে ধূমপান ও ভ্যাপ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- ফ্রান্স: গোসল করার উপযোগী পানির পাশের সমস্ত সৈকতে দেশব্যাপী ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এই নিয়ম ভাঙলে ১৩৫ ইউরো জরিমানা দিতে হবে।
- ইতালি: ভেনেটো, এমিলিয়া-রোমানিয়া, সারদিনিয়া এবং আপুলিয়ার মতো জনপ্রিয় পর্যটন এলাকার অনেক সৈকতে ধূমপান নিষিদ্ধ।
৫. সৈকতে প্রাণী: কুকুর থেকে হাতি পর্যন্ত
ইউরোপে পোষা প্রাণীদের জন্য নিয়মগুলো বেশ কড়া, এমনকি কখনো কখনো কিছু অদ্ভুত নিষেধাজ্ঞাও দেখা যায়:
- কুকুর: ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়ার অনেক 'ব্লু ফ্ল্যাগ' সার্টিফাইড সৈকতে পিক সিজনে কুকুর নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; যেখানে অনুমতি আছে, সেখানেও নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হয়।
- হাতি: সম্ভবত সবচেয়ে বিচিত্র নিষেধাজ্ঞাটি রয়েছে ফ্রান্সের গ্র্যানভিল (নরমান্ডি) শহরে; ২০০৯ সালে একটি সার্কাসের হাতি সমুদ্রে গোসল করার পর পানি দূষিত হওয়ায় কর্তৃপক্ষ সৈকতে এই প্রাণী নিয়ে আসা চিরতরে নিষিদ্ধ করে দেয়।
সারসংক্ষেপ: ইউরোপের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার আগে পর্যটকদের মনে রাখা উচিত যে, স্থানীয় আইন না জানা আপনাকে শাস্তি থেকে রেহাই দেবে না। নিয়ম মেনে চলা কেবল আপনার অর্থই সাশ্রয় করে না, বরং মহাদেশের সেরা সৈকতগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ বজায় রাখতেও সাহায্য করে।



