কল্পনা করুন, আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে আখরোটের সমান প্রাচীন একটি অংশ রয়েছে, যেখানে "আমি সচেতন আছি" এবং "মস্তিষ্ক শক্তি সাশ্রয়ী মোডে আছে"—এই দুই অবস্থার মধ্যে পরিবর্তনের প্রধান সুইচটি লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন এটি ঠিক কীভাবে কাজ করে।
২০২৬ সালের ২৭ মে 'নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার' জার্নালে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, যা চেতনা সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিতে পারে। নিবন্ধটির শিরোনাম সহজ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী: "থ্যালামিক অসিলেশন ডিসটিংগুইশ ন্যাচারাল স্টেটস অফ কনশাসনেস ইন হিউম্যানস" — অর্থাৎ মানুষের চেতনার প্রাকৃতিক অবস্থা শনাক্তকরণে থ্যালামিক কম্পন।
সুস্থ মানুষের থ্যালামাস নিয়ে গবেষণা করা প্রায় অসম্ভব, কারণ এটি মস্তিষ্কের অনেক গভীরে অবস্থিত। তবে গুরুতর মৃগীরোগে আক্রান্ত ১৭ জন রোগীর মস্তিষ্কে ইতিমধ্যেই 'ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন' (DBS) ইলেকট্রোড বসানো ছিল। এই ইলেকট্রোডগুলোই বিজ্ঞানীদের জন্য গবেষণার এক অমূল্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
গবেষকরা টানা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত (গড়ে জনপ্রতি ৪০ ঘণ্টা) থ্যালামাসের কার্যক্রম রেকর্ড করেছেন। একই সাথে মাথার ওপর সাধারণ ইইজি (EEG) এবং চোখের মণির নড়াচড়াও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এর ফলে মস্তিষ্কের গভীর থেকে এক বিশাল তথ্যভাণ্ডার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
তাঁরা ১৯ থেকে ৪৫ হার্টজ রেঞ্জের মধ্যে (দ্রুত বিটা এবং নিম্ন গামা তরঙ্গ) চেতনার একটি স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য ছন্দ বা 'রিদম' খুঁজে পেয়েছেন।
- যখন এই ছন্দটি শক্তিশালী থাকে — তখন মানুষ হয় জেগে থাকে অথবা 'রেম' (REM) ঘুমের মধ্যে উজ্জ্বল স্বপ্ন দেখে।
- যখন এই ছন্দটি প্রায় মিলিয়ে যায় — তখন মানুষ গভীর 'নন-রেম' (NREM) ঘুমের মধ্যে থাকে, যা মূলত শরীরের এক ধরণের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া।
রেম (REM) ঘুমের সময় মস্তিষ্কের আচরণ ছিল বিশেষভাবে কৌতূহলোদ্দীপক। চোখের পাতা বন্ধ থাকা অবস্থায় যখন চোখের মণি দ্রুত নড়তে শুরু করে তখন থ্যালামাসে এই দ্রুত কম্পনের শক্তিশালী তরঙ্গ দেখা দেয়। সেই মুহূর্তে মস্তিষ্ক যেন ঘুমের মধ্যেই 'চেতনা চালু' করে দেয়, যার ফলে মানুষ অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং আবেগপূর্ণ স্বপ্ন দেখে।
সবচেয়ে শক্তিশালী সংকেতগুলো পাওয়া গেছে থ্যালামাসের কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াসগুলোতে, যেগুলোকে অনেক সময় 'চেতনার প্রবেশদ্বার' বলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে এই অংশগুলোতে উদ্দীপনা দেওয়ার মাধ্যমে মানুষকে ন্যূনতম সচেতন অবস্থা এমনকি কোম থেকেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, থ্যালামাস কেবল সংবেদনশীল অঙ্গগুলো থেকে মস্তিষ্কের উপরিভাগে সংকেত পাঠানোর কোনো 'রিলে স্টেশন' নয়। বরং এটি আমাদের চেতনার অবস্থাকে সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণকারী একটি ফিল্টার এবং পরিচালকের ভূমিকা পালন করে।
আগে চেতনার অনেক তত্ত্বে (বিশেষ করে গ্লোবাল ওয়ার্কস্পেস থিওরি) সেরিব্রাল কর্টেক্স এবং নিউরনের সামগ্রিক সক্রিয়তার ওপর জোর দেওয়া হতো। নতুন এই কাজটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করা হয়েছে: থ্যালামাসের সঠিক বিন্যাস ছাড়া এই সক্রিয়তা হয়তো শুরুই হতে পারবে না।
এছাড়া প্রাপ্ত তথ্যগুলো পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, চেতনার প্রক্রিয়াটি আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন এবং গভীর।
থ্যালামাস থেকে প্রাপ্ত এই বায়োমার্কারগুলো ভবিষ্যতে নিচের বিষয়গুলোতে সাহায্য করতে পারে:
- কোমায় থাকা বা ভেজিটেটিভ স্টেটে থাকা রোগীদের অবস্থা আরও নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা;
- মস্তিষ্ক উদ্দীপনার নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা;
- এনেস্থেশিয়া, বিষণ্নতা, সিজোফ্রেনিয়া এবং ঘুমের সমস্যার সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে তা আরও ভালোভাবে বোঝা।
উল্লেখ্যে যে, এই গবেষণায় সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকদের বদলে মৃগীরোগীদের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছে। যদিও খিঁচুনি না থাকা অবস্থায় তথ্যগুলো রেকর্ড করা হয়েছে, তবুও রোগের প্রভাব পুরোপুরি নাকচ করে দেওয়া যায় না। এছাড়া গবেষণাটি কেবল ঘুম এবং জাগরণের স্বাভাবিক পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, কৃত্রিম অবশকরণ বা অন্য কোনো রোগতাত্ত্বিক অবস্থার ওপর নয়।
আমাদের মাথার ভেতরে এক প্রাচীন কিন্তু অত্যন্ত বুদ্ধিমান সুইচ রয়েছে। এটি যখন ১৯-৪৫ হার্টজ ফ্রিকোয়েন্সির দ্রুত ছন্দটি চালু করে, তখন আমরা সচেতন অবস্থায় থাকি (এমনকি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলেও)। আর যখন এটি বন্ধ হয়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক গভীর মেরামতের কাজ বা বিশ্রামে চলে যায়।
এই আবিষ্কারটি আমাদের সুন্দরভাবে মনে করিয়ে দেয় যে: চেতনা কেবল 'বিচক্ষণ মস্তিষ্কের কর্টেক্স' নয়, বরং এটি একটি বিবর্তনীয়ভাবে প্রাচীন এবং গভীর ব্যবস্থা যা নির্ধারণ করে আমরা কখন 'জেগে' থাকব।
চেতনা সংক্রান্ত বিজ্ঞান এখন দার্শনিক আলোচনার গণ্ডি পেরিয়ে সুনির্দিষ্ট নিউরাল মেকানিজম বা স্নায়বিক কার্যপদ্ধতির দিকে এগিয়ে চলেছে। আর এক্ষেত্রে থ্যালামাস এখন সামনের সারিতে চলে আসছে বলে মনে হচ্ছে।




